আমরা দৈনন্দিন জীবনে প্রায় সবাই জানি, গাজর চোখের জন্য ভালো, দুধ হাড় ও দাঁত মজবুত করে। কিন্তু মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখতে ঠিক কী ধরনের খাবার প্রয়োজন, সে বিষয়ে অনেকের পরিষ্কার ধারণা নেই। অথচ বাস্তবতা হলো আমাদের চিন্তা করার ক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, এমনকি মানসিক অবস্থাও অনেকটা নির্ভর করে আমরা কী খাচ্ছি তার ওপর।
নিউরোসায়েন্টিস্ট লিসা মোসকোনির মতে, ‘মস্তিষ্ক একটি শক্তিনির্ভর অঙ্গ। এটি সঠিকভাবে কাজ করতে প্রতিনিয়ত পুষ্টি চায়। তাই শরীরের অন্য অঙ্গের মতোই মস্তিষ্কের যত্ন নিতেও সঠিক খাবার বেছে নেওয়া জরুরি।’ ভুল খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘ মেয়াদে স্মৃতিভ্রংশ, মনোযোগের ঘাটতি এবং মানসিক ক্লান্তির মতো সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
শিশুদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য আরও বেশি গুরুত্ব বহন করে। কারণ শৈশবেই মানুষের মস্তিষ্ক সবচেয়ে দ্রুত বিকশিত হয়। জন্মের পর প্রথম কয়েক বছরে শিশুদের মস্তিষ্কে বিপুল হারে নতুন নিউরন তৈরি হয় এবং নিউরনের মধ্যে সংযোগ গড়ে ওঠে। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি শিশুর মস্তিষ্কে নিউরনের সংখ্যা মিল্কি ওয়েতে থাকা তারার সংখ্যার চেয়েও বেশি হতে পারে। এই সময় পর্যাপ্ত ও সঠিক পুষ্টি না পেলে মস্তিষ্কের বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়তে পারে।
বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় ৪৫ ধরনের পুষ্টি উপাদান শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে প্রোটিন, জিংক, আয়রন, কোলিন, ফোলেট, আয়োডিন, ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন বি১২ এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব উপাদান শিশুদের স্নায়ুতন্ত্রের সঠিক বিকাশে সাহায্য করে এবং বড়দের ক্ষেত্রে স্মৃতিশক্তি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
ব্লুবেরি, ব্ল্যাকবেরি, রাসবেরি ও স্ট্রবেরির মতো বেরি ফল মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এসব ফলে থাকা ভিটামিন সি ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট মস্তিষ্কের কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। পাশাপাশি এগুলো নিউরোট্রান্সমিটার তৈরিতে সাহায্য করে, যা স্নায়ুসংকেত আদান-প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বেরি ফল দইয়ের সঙ্গে, চকলেটে ডুবিয়ে বা হালকা ডেজার্ট হিসেবেও খাওয়া যেতে পারে।
আলুতে থাকা বিভিন্ন অ্যামিনো অ্যাসিড মস্তিষ্কে নিউরোট্রান্সমিটার উৎপাদনে সহায়তা করে। এর ফলে মেজাজ নিয়ন্ত্রণ সহজ হয় এবং ঘুমের মান উন্নত হতে পারে। সহজলভ্য ও পুষ্টিকর এই খাবার শিশুদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে, তবে ভাজা না খেয়ে সেদ্ধ বা হালকা রান্না করাই ভালো।
মিষ্টি আলু ভিটামিন এ-এর একটি উৎকৃষ্ট উৎস। এই ভিটামিন স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ ও কার্যকারিতার জন্য প্রয়োজনীয়। মিষ্টি আলু নিয়মিত খেলে স্নায়ুর স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং মস্তিষ্কের শক্তি বাড়ে। সেদ্ধ, বেকড বা স্যুপ আকারে এটি সহজেই খাদ্যতালিকায় যুক্ত করা যায়।
মানব মস্তিষ্কের বড় একটি অংশ ফ্যাট দিয়ে তৈরি। এই ফ্যাটের মধ্যে ডিএইচএ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা শেখার ক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতে সহায়তা করে। স্যালমন, মাকেরেল ও সারডিনের মতো ঠান্ডা পানির মাছ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডে সমৃদ্ধ। শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক—উভয়েরই নিয়মিত মাছ খাওয়া মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
ডার্ক চকলেটে থাকা ট্রিপটোফ্যান মস্তিষ্কে সেরোটোনিন নামের একটি রাসায়নিক উৎপাদনে সাহায্য করে। সেরোটোনিন আমাদের মেজাজ ভালো রাখতে এবং মানসিক চাপ কমাতে ভূমিকা রাখে। তবে অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালরিযুক্ত চকলেট স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, তাই সীমিত পরিমাণে ডার্ক চকলেট খাওয়াই ভালো।
ডিমে থাকা কোলিন মস্তিষ্কের কোষকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে এবং স্মৃতিশক্তি বাড়ায়। এটি মনোযোগ ধরে রাখা, দ্রুত শেখা এবং চিন্তাশক্তি বাড়াতে সহায়ক। শিশুদের জন্য ডিম একটি সহজ, সাশ্রয়ী ও পুষ্টিকর খাবার হিসেবে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে শুধু খাবারই নয়, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণও সমান জরুরি। শিশুদের ক্ষেত্রে পুষ্টিকর খাবারকে আকর্ষণীয়ভাবে পরিবেশন করলে তারা সহজেই ভালো খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে পারে। পরিবারের সব সদস্য যদি নিয়মিত এসব পুষ্টিকর খাবার খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে মস্তিষ্কের সঠিক বিকাশ ও কার্যক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফি