কল্পনা করুন, ভ্যাটিকান লাইব্রেরির ৪০০ বছরের পুরোনো অন্ধকার কোণে পড়ে আছে ৪০৮ পৃষ্ঠার একটি রহস্যময় বই। তার পাতাগুলোজুড়ে অদ্ভুত সব প্রতীক, রোমান হরফ আর আরবি হরফের এক অবোধ্য মিশ্রণ। দীর্ঘ ৪০০ বছর ধরে কেউ উদ্ধার করতে পারেনি এর ভেতরের আসল বার্তা। ইতিহাসের ধুলোবালি মাখা গোপন কুঠুরিতে লুকিয়ে থাকা রহস্যের জট খুলতে সব সময় মানুষের এক আদিম কৌতূহল কাজ করে। ঠিক যেন বাস্তব জীবনের এক রোমাঞ্চকর গোয়েন্দা গল্প! শত শত বছর ধরে লাইব্রেরি আর আর্কাইভের অন্ধকারে পড়ে থাকা এমন কিছু সংকেত বা ‘ক্রিপ্টোগ্রাফিক কোড’ এবার আলোর মুখ দেখছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ছোঁয়ায়। সম্প্রতি বিবিসির একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কীভাবে প্রযুক্তির সহায়তায় উন্মোচিত হচ্ছে মধ্যযুগীয় নানা গোপন নথি, প্রেমের চিঠি আর অদ্ভুত সব চিকিৎসা পদ্ধতি।
বইটির নাম ‘বর্গ সাইফার’। সুইডেনের স্টকহোম ইউনিভার্সিটির কম্পিউটেশনাল লিঙ্গুইস্টিকের অধ্যাপক বিয়াতা মেগিয়েসি এবং তাঁর দল এই রহস্যের জট খুলেছেন। আর এই কাজে তাঁদের মূল হাতিয়ার ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। গবেষক দল কোড ভেঙে যা পেলেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য! বইটিতে লুকিয়ে ছিল মধ্যযুগীয় সব অদ্ভুত চিকিৎসা পদ্ধতি। যেমন আমাশয় নিরাময়ের জন্য ময়দার মণ্ড বা ডোর ভেতর জায়ফল গেঁজিয়ে নেওয়া কিংবা কয়েক গ্লাস খাঁটি লাল ওয়াইন পান করার মতো বিচিত্র সব দাওয়াই। সে সময়ে ডাইনিবিদ্যার অপবাদ বা শাস্তির ভয়ে এসব ঔষধি চর্চা এভাবে সংকেতের আড়ালে লুকিয়ে রাখা হতো।
গবেষকদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন আর্কাইভ ও লাইব্রেরিতে থাকা ঐতিহাসিক নথির প্রায় ১ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে এনক্রিপ্ট বা সংকেত দিয়ে লুকিয়ে রাখা। প্রাচীন গ্রিস ও রোমান আমল থেকে এই প্রবণতা চলে আসছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষ কেন তাদের সাধারণ লেখা এভাবে লুকিয়ে রাখত?
মূলত সিংহাসন উদ্ধার বা যুদ্ধের রণকৌশল গোপন রাখতে এমন কোড ব্যবহার করা হতো। এ ছাড়া বিভিন্ন গোপন সংগঠনের নিজস্ব আচার-অনুষ্ঠান বা নিয়মকানুন আড়াল করতে এই ধরনের গোপন প্রতীক ব্যবহার করা হতো। ডাইনিবিদ্যা চর্চায় শাস্তির ভয় থেকে চিকিৎসা পদ্ধতি রক্ষা করা কিংবা নিষিদ্ধ প্রেমের চিঠি আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও এমন গোপনীয় কোড ব্যবহার করা হতো। স্কটল্যান্ডের রানি মেরি ইংল্যান্ডে বন্দী থাকার সময় কিছু চিঠি লিখেছিলেন। সেগুলোও গুপ্ত অবস্থায় ছিল। সেই সব চিঠি থেকে জানা যায়, নিজের সিংহাসন ফিরে পেতে মেরি চক্রান্ত করছিলেন। আবার স্পেনের রাজা পঞ্চম চার্লসের ৫০০ বছরের পুরোনো এক চিঠি ডিকোড করতে ক্রিপ্টোলজিস্ট সেসিল পিয়েরো ও তাঁর দলের সময় লেগেছিল দীর্ঘ ছয় মাস! সেখানে দেখা যায়, সে সময়কার ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী এই শাসক ফরাসি রাজার এক ভাড়াটে খুনির হাতে খুন হওয়ার ভয়ে রীতিমতো সিঁটিয়ে ছিলেন।
সাধারণত ক্রিপ্টোলজিস্টরা কোনো ভাষার অক্ষরের পুনরাবৃত্তির ফ্রিকোয়েন্সি বা হার হিসাব করে কোড ভাঙেন। যেমন ইংরেজিতে ‘ই’ অক্ষরটি বেশি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু প্রাচীন কোড লেখকেরাও তো কম চতুর ছিলেন না! তাঁরা একটি অক্ষরের জন্য একাধিক প্রতীক ব্যবহার করতেন কিংবা বিভ্রান্ত করার জন্য অর্থহীন ভুয়া প্রতীক ঢুকিয়ে দিতেন। তার ওপর যোগ হতো শত বছরের পুরোনো অস্পষ্ট হাতের লেখা ও বিবর্ণ কালি।
এখানে নরওয়ের অসলো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মিশেল ওয়ালডিস্পুহ্ল ‘ট্রান্সক্রিবাস’ নামের একটি অনলাইন এআই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ১৬৩৭ সালের ৩০ বছরের যুদ্ধের সময়কার এক গোপন চিঠির সফল ডিজিটাল রূপান্তর করেছেন।
বর্তমানে এই গবেষকেরা ‘ডেসক্রিপ্ট’ প্রজেক্টের অধীনে আরও উন্নত এআই মডেল তৈরি করছেন। এর লক্ষ্য হলো, হাতের লেখার ছবি বিশ্লেষণ, ট্রান্সক্রিপশন বা ডিজিটালাইজ করা এবং ডিক্রিপশন বা কোড ভাঙা।
অধ্যাপক মেগিয়েসির দল এখন এমন একটি এআই চ্যাটবট টুল তৈরি করেছে, যা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল এবং ইমেজ রিকগনিশন অ্যালগরিদমের এক চমৎকার সমন্বয়। এই চ্যাটবট শুধু কোড ভেঙেই ক্ষান্ত হয় না, সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীন ভাষার অনুবাদ করে দেয় এবং তার ব্যাখ্যাও হাজির করে—যাতে কোনো কৃত্রিম ভুল তথ্য না থাকে। যে ‘বর্গ সাইফার’ ডিকোড করতে মানুষের বছরের পর বছর লেগে যেত, এই নতুন এআই চ্যাটবট তার ৫০০ প্রতীকের একটি অংশ মাত্র ২৯ মিনিটে নিখুঁতভাবে ডিকোড এবং ইংরেজিতে অনুবাদ করে দেখিয়েছে।
ইতিহাসের ছেঁড়া পাতাগুলো এত দিন অবোধ্য চিহ্নের আড়ালে হারিয়ে গিয়েছিল। এআই চ্যাটবটের হাত ধরে সেগুলো এখন জীবন্ত হয়ে উঠছে। এই প্রযুক্তির সাফল্য শুধু মধ্যযুগীয় চিঠিতেই সীমাবদ্ধ নয়। গবেষকদের পরবর্তী লক্ষ্য আরও বড়। ক্রিট দ্বীপে পাওয়া চার হাজার বছরের পুরোনো রহস্যময় ‘ফিস’ কিংবা প্রাচীন গ্রিক ভাষার আদি রূপ ‘লিনিয়ার এ’ ডিকোড করা। আজ পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষ সেগুলো পড়তে পারেনি। সেগুলোর রহস্য উন্মোচনেও এখন আশার আলো দেখাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষও একটি প্রাচীন সংকেতের ছবি আপলোড করে জেনে নিতে পারবেন কয়েক শ বছর আগের কোনো প্রেমিকের আকুলতা কিংবা কোনো রাজার গোপন আতঙ্কের গল্প।
সূত্র: বিবিসি