সম্পর্কের টানাপোড়েন মানুষের জীবনের এক অমীমাংসিত জটিলতা। কখনো ভালোবাসা থাকে, কিন্তু বোঝাপড়া হয় না। কখনো আবার অভাব থাকে শুধু স্বচ্ছতার। অনেক সময় আমরা একটি সম্পর্কে বারবার ফিরে আসি, আবার দূরে সরে যাই। একে মনস্তাত্ত্বিক ভাষায় বলা হয়, ‘সাইক্লিং রিলেশনশিপ’ বা ‘অন-অ্যান্ড-অফ’ সম্পর্ক। অনেকে একে সরাসরি টক্সিক বা বিষাক্ত বলে আখ্যা দিলেও গবেষণায় দেখা গেছে, এই চক্রাকার সম্পর্ক সব সময় খারাপ নয়। এটি অনেক ক্ষেত্রে আত্ম-আবিষ্কারের মাধ্যমও হতে পারে। সম্পর্কের গভীরতা, এর কারণ এবং উত্তরণের পথ খুঁজে নিতে হবে নিজেকেই।
চক্রের পেছনের চালিকাশক্তি
যুবক ও তরুণ প্রজন্মের ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ মানুষ তাদের জীবনে অন্তত একবার প্রাক্তন সঙ্গীর কাছে ফিরে যাওয়ার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান। কিন্তু কেন আমরা বারবার একই মানুষের কাছে ফিরে যাই, এর কোনো সঠিক উত্তর হয় না। বরং অনেক কারণ বলা যেতে পারে।
বিচ্ছেদের যন্ত্রণা: অনেকের কাছে বিচ্ছেদের কষ্ট সহ্য করা কঠিন। সেই সাময়িক ব্যথা উপশম করতে তাঁরা দ্রুত পুনরায় সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্লান্তি: বর্তমানে ডেটিং অ্যাপের যুগে মানুষের হাতে বিকল্প অনেক। কিন্তু প্রতিদিন এত মানুষের ভিড়ে নতুন কাউকে চেনা বা পছন্দ করা ক্লান্তিকর মনে হয়। তখন পরিচিত সেই মানুষের কাছে ফিরে যাওয়াই সহজ সমাধান মনে হয়।
জীবনের ব্যস্ততা: অনেকের কর্মজীবন বা ব্যক্তিগত জীবন এতই চ্যালেঞ্জিং যে তাঁরা সঙ্গীকে যথাযথ সময় দিতে পারেন না। ফলে তাঁরা সাময়িকভাবে আলাদা হন এবং জীবন শান্ত হলে আবার ফিরে আসেন।
অস্পষ্ট চাহিদা: আপনি সম্পর্ক থেকে ঠিক কী চাচ্ছেন, তা যদি পরিষ্কার না থাকে; তবে না পারবেন থাকতে, না পারবেন ছেড়ে যেতে।
স্মৃতির মায়া ও সময়কে ‘কারেন্সি’ ভাবা: বছরের পর বছর একজনের পেছনে যে সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করেছেন, তা নষ্ট হয়ে যাবে ভেবে অনেকে পুরোনো সম্পর্কে আটকে থাকেন। নতুন করে কাউকে চেনা ও আবিষ্কার করার চেয়ে পরিচিত মানুষটির গভীর অস্তিত্ব অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়।
প্রতিশ্রুতির ভয়: যখন সম্পর্ক ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হতে শুরু করে, সে সময় অনেকে ভয়ে পিছিয়ে যান। কিন্তু টান অনুভব করলে আবার ফিরে আসেন। এটি দীর্ঘ মেয়াদে বেশ ক্ষতিকর।
কখন এই চক্রাকার সম্পর্ক কাজ করে
সব অন-অ্যান্ড-অফ সম্পর্ক মানেই বিষাক্ত নয়। কিছু ক্ষেত্রে এটি অংশীদারদের জন্য কার্যকর হতে পারে।
লং ডিস্ট্যান্স বা দূরবর্তী সম্পর্ক: দূরে থাকা অবস্থায় সব সময় প্রতিশ্রুতি রাখা কঠিন হলে অনেকে সাইক্লিং বা নির্দিষ্ট সময় অন্তর সম্পর্কের চর্চা করতে পছন্দ করেন।
ব্যস্ত ক্যারিয়ার: যখন দুজনের ক্যারিয়ারই খুব চাহিদাপূর্ণ, তখন তাঁরা নিজেদের সুবিধামতো সময়ে সম্পর্কে ‘অন’ থাকেন।
উভয়ের সম্মতি ও আলাপ: যদি দুজন সঙ্গীই বিষয়টি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেন এবং একমত হন যে তাঁদের বর্তমান মানসিক অবস্থা বা চাহিদা হেতু এই ধরনটিই সেরা, তবে তা কার্যকর হতে পারে।
কখন এটি বিপজ্জনক
সবচেয়ে বড় বিপদের জায়গা হলো, যখন এই চক্র অ্যাবিউস বা নির্যাতনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ২০১৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা বারবার সম্পর্কে ভাঙাগড়ার খেলায় থাকেন, তাঁদের ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনের ঝুঁকি দ্বিগুণ এবং মানসিক নির্যাতনের ঝুঁকি ৫০ শতাংশ বেশি।
আত্মসম্মান কমিয়ে দেওয়া: সঙ্গী যদি বারবার দুর্ব্যবহারের পর ক্ষমা চেয়ে ফিরে আসে এবং কিছুদিন পর আবার একই কাজ করে, তবে বুঝতে হবে তিনি আপনার সহনশীলতা ও আত্মসম্মান কমিয়ে দিচ্ছে।
ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা: ‘নতুন কাউকে পাব না’ এমন ভয় থেকে সম্পর্কে থাকা কখনোই স্বাস্থ্যকর নয়।
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা: উদ্বেগ, বিষণ্নতা বা বাইপোলার ডিসঅর্ডারের মতো সমস্যাগুলো অনেক সময় এই চক্রকে জ্বালানি জোগায়। নিজেকে সুস্থ না করে সঙ্গীর মধ্যে সমাধান খোঁজা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বিষাক্ত সম্পর্ক এড়ানোর উপায় ও সঠিক প্রশ্ন
এই চক্রে আটকা পড়লে নিজেকে কিছু কঠিন প্রশ্ন করা জরুরি। যেমন
এর জন্য পরামর্শ হলো, আপনার চাহিদাগুলো একটি কাগজে লিখে রাখুন। বারবার তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। সুস্থ যোগাযোগের অভাবই মূলত এই চক্রের প্রধান কারণ।
হয় ‘অন’ না হয় ‘অফ’
স্থায়ীভাবে সম্পর্কে থাকতে চাইলে নিজেদের মধ্যে শতভাগ সততা নিশ্চিত করুন। একে অপরকে দোষারোপের খেলা বন্ধ করে আবেগগুলো খোলাখুলি প্রকাশ করুন। কেন বারবার বিচ্ছেদ হচ্ছে, সেই মূল কারণটি চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা করুন। এটি অনেক শ্রমসাধ্য কাজ। এর জন্য আপনার সময়ও ব্যয় করতে হবে। স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসতে চাইলে পুরোনো সম্পর্কের বছরগুলোকে ‘নষ্ট সময়’ ভাববেন না। একে একটি ‘শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা’ হিসেবে দেখুন। জানুন, এই বিষয়টি আপনাকে পরিণত করেছে। সম্পর্ক থেকে চূড়ান্ত বিদায় নেওয়ার পর কিছুদিনের জন্য সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করুন। এটিই সবচেয়ে কঠিন, কিন্তু কার্যকর অংশ।
সম্পর্ক শুধু একটি একক সত্তা নয়, এটি আমাদের শৈশব এবং অতীতের অভিজ্ঞতাও বর্তমান সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। যদি সম্পর্কে কোনো আসন্ন বিপদ না থাকে, তবে হুট করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে একটু থামুন। নিজের ভেতরের বিশ্বাস ও অনুভূতিগুলোকে পর্যবেক্ষণ করুন। দিন শেষে, একটি সম্পর্ক শুধু তখনই সার্থক, যখন তা আপনার মানসিক শান্তি নিশ্চিত করে।
সূত্র: মিডিয়াম, স্টার্স ইনসাইডার