মো. সুলতান মাহমুদ নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৎস্য ও সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। তিনি ৪৪তম বিসিএসে মৎস্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। বিসিএসে তাঁর ভাইভা হয়েছিল প্রায় ২৫ মিনিটের মতো। অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন তিনি।
চেয়ারম্যান: ফিশারিজ থেকে কোথায় কোথায় চাকরি করা যায়?
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, ফিশারিজ থেকে বিসিএস হলে ফিশারিজ ক্যাডারে যোগদান করা যায়।
চেয়ারম্যান: সেটি তো অবশ্যই। তা ছাড়া আর কোথায় চাকরি করতে পারতেন?
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, বিভিন্ন ফিশ ফিড কোম্পানিতে, গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে কাজ করার সুযোগ আছে। এ ছাড়া নানা ফিশারিজ প্রকল্পেও কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
চেয়ারম্যান: ফিশারিজ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে নবীনদের কীভাবে অনুপ্রাণিত করবেন?
মো. সুলতান মাহমুদ: নবীনদের বলব, ফিশারিজ থেকে বিসিএস ক্যাডারে যোগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কেউ চাইলে গবেষক হতে পারেন, আবার কেউ নিজ উদ্যোগে ফিশারিজভিত্তিক কোনো প্রকল্প শুরু করতে পারেন। এ পেশায় সম্ভাবনা অনেক বেশি।
চেয়ারম্যান: তাহলে বলুন তো, ফিশারিজ ক্যাডার ও বেসরকারি খাতে চাকরির মধ্যে পার্থক্য কী?
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, ফিশারিজ ক্যাডার সার্ভিসে একটি পূর্বনির্ধারিত কাঠামো থাকে, ফলে শুরুতে তুলনামূলকভাবে চ্যালেঞ্জ কম। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে নিজেকে প্রমাণ করে জায়গা তৈরি করতে হয়, তাই প্রাথমিক পর্যায়ে চ্যালেঞ্জ বেশি।
চেয়ারম্যান (হাসি দিয়ে): তাহলে কি আমি ধরে নেব, মিস্টার সুলতান মাহমুদ চ্যালেঞ্জ নিতে চান না বলেই বিসিএস ক্যাডার হতে চান?
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার (হেসে), বিসিএস ক্যাডার হওয়াটাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং কঠোর পরিশ্রমের বিষয়।
চেয়ারম্যান: অবশ্যই, বিসিএসও অনেক পরিশ্রমের কাজ। মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন, বিসিএস ক্যাডারে সিকিউরিটি বেশি, প্রাইভেটে কম।
মো. সুলতান মাহমুদ: জি স্যার।
চেয়ারম্যান: সুলতান মাহমুদ, আপনাকে নিয়ে একটু গভীরে যাই। বলুন তো IQ-এর Q কী?
মো. সুলতান মাহমুদ: Quotient, স্যার।
চেয়ারম্যান: গুড। EQ কী?
মো. সুলতান মাহমুদ: EQ মানে Emotional Quotient.
চেয়ারম্যান: গুড, সংজ্ঞা বলুন।
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, অন্যের আবেগ অনুধাবন করে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার যে ক্ষমতা, সেটাই Emotional Quotient.
চেয়ারম্যান: খুব ভালো, ধন্যবাদ। আপনার কোনো বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ আছে?
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, ডিপার্টমেন্টের বিভিন্ন কোর্সের অংশ হিসেবে কিছু ফিল্ড ভিজিট করেছি এবং থিসিস সম্পন্ন করেছি।
চেয়ারম্যান: থিসিস তো একাডেমিক অর্জন, প্রশিক্ষণ নয়। কোনো বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন?
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার (বিনয়ের সঙ্গে), আমার সে ধরনের কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণ এখনো নেই।
চেয়ারম্যান: আপনারা প্রশিক্ষণ নেন না, আবার বলেন আমরা আপনাদের চাকরি দিই না! ঠিক আছে, বলুন তো বর্তমান সমাজে সামাজিক অস্থিরতা কেন বাড়ছে? পারিবারিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলুন।
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, বর্তমানে পরিবারগুলোতে নৈতিক মূল্যবোধ অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে।
চেয়ারম্যান: সেটা কীভাবে?
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, বর্তমান প্রজন্ম মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে পড়ছে, ফলে সন্তানদের সঙ্গে পিতামাতা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের আবেগ ও অনুভূতির দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। এই আবেগময় দূরত্ব থেকে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে।
চেয়ারম্যান: কী করলে শিক্ষার্থীরা থিসিসে আগ্রহী হবে?
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, থিসিসে কাজ করা শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত ফান্ডিং ও সহায়তার ব্যবস্থা করা হলে তারা আরও আগ্রহী হবে। পাশাপাশি তাদের বোঝাতে হবে, থিসিস গবেষণা ভবিষ্যতে নানা সুযোগের দ্বার খুলে দিতে পারে।
চেয়ারম্যান: আপনাকে যদি ফিশারিজ শিক্ষায় পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে কী করতেন?
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, সুযোগ পেলে আমি ল্যাব ও ফিল্ড ওয়ার্কে আরও জোর দিতাম, যেন শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিখতে পারে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাজের সুযোগ তৈরি করতাম। এতে তারা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে, নিজেদের দক্ষ করে তুলতে পারবে এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবে।
চেয়ারম্যান: BIMSTEC-এর নাম শুনেছেন তো? এটা কী?
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, Bay of Bengal Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation। এটি বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে গঠিত একটি আঞ্চলিক সংস্থা, যা সদস্যদেশগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে।
চেয়ারম্যান: গুড। আমরা গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি করি, গার্মেন্টস ছাড়া আর কী কী পণ্য রপ্তানি করা যায়?
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, ফিশারিজ একটি দ্রুত বর্ধনশীল সেক্টর। আমরা মাছ ও সামুদ্রিক পণ্য রপ্তানি করতে পারি। এ ছাড়া আইসিটি পণ্য, চামড়াজাত দ্রব্য ইত্যাদিও রপ্তানির সম্ভাবনাময় খাত।
চেয়ারম্যান: আইসিটি পণ্য কেন? (এটাই আমার শেষ প্রশ্ন)
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, বর্তমানে দেশে অনেক আইসিটি পার্ক নির্মাণ চলছে, যার ফলে সেখান থেকে সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি পণ্য রপ্তানির সুযোগ বাড়ছে।
এক্সটার্নাল-১: আপনার থিসিসের টপিক কী এবং ফাইন্ডিং কী?
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, আমার থিসিসের শিরোনাম হলো ‘Resource Utilization and Ecosystem Services of Noakhali Khal.’ এই গবেষণার মাধ্যমে আমি নোয়াখালী খালের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকা, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং এই খালটি কীভাবে তাদের উপকারে আসছে— এসব বিষয় বিশ্লেষণ করেছি। এ ছাড়া পানির দূষণের অবস্থা মূল্যায়ন করেছি এবং মাছের CPUE (Catch Per Unit Effort) নির্ণয় করেছি। এর ফলে দূষিত এলাকা চিহ্নিত করা এবং দূষণ-সংবেদনশীল মাছের প্রজাতি নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে।
এক্সটার্নাল-১: বাহ্! আপনি তো খুব ভালো কাজ করেছেন। নোয়াখালী খালই কেন নির্বাচন করলেন?
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, এই খালটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৬ কিলোমিটার। নোয়াখালীর মানুষ তাদের জীবিকা, ধান উৎপাদন, মাছ চাষসহ দৈনন্দিন নানা কাজে সরাসরি এ খালের ওপর নির্ভরশীল। তাই গবেষণার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে নির্বাচন করেছি।
এক্সটার্নাল-১: Comfortable Zone থেকে Challenging Zone-এ ট্রান্সফর্ম হওয়ার পদ্ধতি কী?
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, এই মুহূর্তে বিষয়টি আমার মনে পড়ছে না।
এক্সটার্নাল-১: ঠিক আছে, কোনো সমস্যা নেই। বলুন তো, মৎস্যে কী কী সম্ভাবনাময় এবং ক্রমবর্ধমান সেক্টর আছে, যা আমরা কাজে লাগাতে পারি?
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, আমরা ব্লু ইকোনমি ধারণাটি কাজে লাগাতে পারি। এ ছাড়া চিংড়ি উৎপাদন, শুঁটকি উৎপাদন, বায়োফ্লক প্রযুক্তি এবং IPRS পদ্ধতিতে মাছ চাষ এসব ক্ষেত্র বর্তমানে সম্ভাবনাময়।
এক্সটার্নাল-১: ব্লু ইকোনমি কাকে বলে?
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, সমুদ্রের ইকোসিস্টেমের কোনো ক্ষতি না করে সমুদ্রের সম্পদকে কাজে লাগিয়ে একটি দেশ যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন সাধন করে, তাকেই ব্লু ইকোনমি বলা হয়।
এক্সটার্নাল-২: আপনার প্রথম পছন্দ কোনটি?
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, বিসিএস প্রশাসন।
এক্সটার্নাল-২: ফিশারিজে পড়াশোনা করে প্রশাসনে আসতে চান কেন?
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, থিসিসের কাজ করার সময় খুব কাছ থেকে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট উপলব্ধি করেছি। আমি মনে করি, প্রশাসন ক্যাডার থেকে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে সরাসরি কাজ করা সম্ভব। এ ছাড়া একজন ইউএনও হিসেবে খাল পুনরুদ্ধার এবং দূষণমুক্ত রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারব।
এক্সটার্নাল-২: আপনি প্রশাসনে এসে যা করতে পারবেন, তা তো ফিশারিজে করাও সম্ভব। আচ্ছা বলুন তো, সুলতান মাহমুদ কে ছিলেন?
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, সুলতান মাহমুদ ছিলেন গজনীর সম্রাট। তিনি ভারতবর্ষে ১৭ বার আক্রমণ চালিয়ে প্রতিবারই বিজয় অর্জন করেন। তাঁর অন্যতম বিখ্যাত অভিযান ছিল, মনাথ মন্দির অভিযান।
এক্সটার্নাল-২: জেলেরা নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরে, এটি কীভাবে বন্ধ করবেন?
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, এ ক্ষেত্রে আমি Community Engagement বৃদ্ধি করব। অর্থাৎ জেলে, প্রশাসন, এনজিও এবং স্থানীয় জনগণসহ সকল স্টেকহোল্ডারকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বৃদ্ধি করব।
এক্সটার্নাল-২: একটি স্পেসিফিক পদক্ষেপ বলুন, যাতে জেলেরা মাছ ধরতে না যায়।
মো. সুলতান মাহমুদ: স্যার, নিষেধাজ্ঞার সময় যদি আমরা জেলেদের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে তারা মাছ ধরতে যাবে না।
চেয়ারম্যান: ধন্যবাদ, আপনার ভাইভা শেষ। আপনি আপনার ডকুমেন্টগুলো নিয়ে যান। আপনি কি আপনার সব ডকুমেন্ট সঠিকভাবে জমা দিয়েছেন?
মো. সুলতান মাহমুদ: আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, জি স্যার।
চেয়ারম্যান: সুলতান মাহমুদ, আপনার জন্য শুভকামনা রইল।