ইতিহাস সাক্ষী, ক্ষমতা মানুষকে বদলে দেয়। সিংহাসনের চূড়ায় উঠলেই অনেকের হৃদয় শক্ত হয়ে যায়, করুণা শুকিয়ে যায় এবং সত্যের জায়গায় স্বার্থ আসন গেড়ে বসে। কিন্তু ইসলাম ক্ষমতাকে কখনো ভোগের বস্তু বা গৌরবের আসন হিসেবে দেখেনি; বরং একে দেখেছে এক ভারী আমানত হিসেবে।
ইসলামে নেতৃত্ব কোনো পদবি নয়, বরং এটি একটি বিশাল দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) আবু জার (রা.)-কে সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘হে আবু জার, তুমি দুর্বল; আর নেতৃত্ব একটি আমানত। কিয়ামতের দিন তা হবে লজ্জা ও অনুতাপের কারণ, যদি তা যথাযথভাবে আদায় করা না হয়।’ (সহিহ্ মুসলিম)
ইসলামে নেতৃত্ব নিজে থেকে চাওয়া নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তবে দায়িত্ব এলে তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা বাধ্যতামূলক। কারণ, নেতৃত্বহীন সমাজে বিশৃঙ্খলা জন্ম নেয়।
নেতৃত্বের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। কোরআন ঘোষণা করে, ‘আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান সে, যে সবচেয়ে পরহেজগার বা মুত্তাকি।’ (সুরা হুজুরাত: ১৩)
একজন নেতা যদি আল্লাহকে ভয় না করেন, তবে কেবল পার্থিব আইন তাঁকে সৎ রাখতে পারে না। তাকওয়াই হলো অন্তরের প্রহরী। হজরত উমর (রা.)-এর জীবন এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। রাতের আঁধারে যখন তিনি নিজের কাঁধে খাদ্যের বস্তা বহন করতেন এবং কেউ সাহায্য করতে চাইলে বলতেন, ‘কিয়ামতের দিন কি তুমি আমার গুনাহের বোঝাও বহন করবে?’ —এই জবাবদিহির বোধই হলো প্রকৃত তাকওয়া।
ন্যায়বিচার ছাড়া কোনো নেতৃত্বই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়বিচার ও সদাচরণের নির্দেশ দেন।’ (সুরা নাহল: ৯০)
ইসলামে ন্যায়বিচার কেবল আদালতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিয়োগ, সম্পদ বণ্টন এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তে ইনসাফ নিশ্চিত করা শাসকের দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘোষণা অনুযায়ী, ন্যায়পরায়ণ শাসক কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া পাবেন।
নেতৃত্বের জন্য শুধু ধার্মিক হওয়া যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন যোগ্যতা। হজরত ইউসুফ (আ.)-এর ভাষায় নেতৃত্বের দুটি প্রধান গুণ হলো: এক. চারিত্রিক সততা ও বিশ্বস্ততা। দুই. প্রশাসনিক কাজে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রজ্ঞা।
যোগ্যতাহীন পরহেজগার যেমন প্রশাসনের ক্ষতি করতে পারে, তেমনি দক্ষ কিন্তু নীতিহীন ব্যক্তি সমাজকে ধ্বংস করে দেয়।
ইসলাম একনায়কতন্ত্রের ঘোর বিরোধী। কোরআনে মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে, ‘তাদের কাজ পরামর্শের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।’ (সুরা শুরা: ৩৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং ওহির অধিকারী হয়েও সাহাবাদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। ওহুদের যুদ্ধে তরুণদের মতামত গ্রহণ করে তিনি মদিনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা সবার মতামতকে মর্যাদা দেওয়ার এক অনন্য উদাহরণ।
ইসলামি নেতৃত্বে নেতা নিজেকে শাসক নয়, বরং জনগণের খাদেম মনে করেন। প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) খিলাফত গ্রহণের পর বলেছিলেন, ‘আমি সঠিক হলে আমাকে সাহায্য করো, আর ভুল করলে সংশোধন করে দিয়ো।’
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চিরকালীন অমর বাণী, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই রাখাল এবং প্রত্যেকেই তার পাল (অধীনস্থ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহিহ্ বুখারি)
সিংহাসন একদিন খালি হয়, নামফলক বদলে যায়, কিন্তু আমলনামা অপরিবর্তিত থাকে। ক্ষমতার দিনগুলো মানুষের মধ্যে পালাক্রমে পরিবর্তিত হয়। (সুরা আলে ইমরান: ১৪০)। যারা তাকওয়ার ভিত্তিতে নেতৃত্ব দেয়, তারাই ইতিহাসে আলো ছড়ায়। তাই ক্ষমতার স্বপ্ন দেখার আগে নিজের তাকওয়ার ভিত মজবুত করা এবং নিজেকে যোগ্য করে গড়া প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য।
মনে রাখতে হবে, কিয়ামতের বিচারে মানুষের করতালি নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টিই হবে প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।
লেখক: মুহাম্মাদ মুহিব্বুল্লাহ, প্রাবন্ধিক ও গবেষক