তুরস্কের কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের আরতভিন প্রদেশের বোরচকা জেলার মারাল গ্রামের জীর্ণ এক কাঠের মসজিদ। বাইরে থেকে দেখলে মসজিদটিকে একদম সাদামাটা আর একঘেয়ে মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। পাহাড়ের এক ঢালু খাঁজে, আঁকাবাঁকা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্থাপনাটিকে প্রথম দর্শনে কোনো প্রাণহীন পরিত্যক্ত ঘর ভেবে ভুল করা স্বাভাবিক। দেয়ালের কাঠগুলো পুরোনো—পাশের ধাতব মিনারের সঙ্গে ঠিক মানাচ্ছে না। ১৬০ বছর ধরে এভাবেই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক এই স্থাপনা। তবে বাইরে থেকে জীর্ণ মনে হলেও এর আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে ছিল দরজার ওপাশে।
মসজিদটির মেঝে থেকে দেয়াল হয়ে গম্বুজের ছাদ পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে রঙের এক বিচিত্র সমাহার। কোনো এক অদৃশ্য টানে সেদিকে চেয়ে থাকতে হয় যে কাউকে। কারণ এর প্রকৃত সৌন্দর্য মিশে আছে নিপুণ কারিগরিতে আর সূক্ষ্ম সব কারুকার্যে।
দেয়ালজুড়ে শোভা পাচ্ছে পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াত। প্রতিটি অত্যন্ত যত্ন নিয়ে হাতে আঁকা। এক অদ্ভুত মোচড় দিয়ে ছাদটি উদীয়মান জাপানি সূর্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে তফাৎ হলো এটি শুধু লাল-সাদায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং নানা রঙের বর্ণিল সমন্বয়। জানালা দিয়ে তাকাতেই চোখে পড়ে বাইরের সবুজ উপত্যকার মনোরম দৃশ্য।
কাঠের কাজ আর উজ্জ্বল রংগুলো দৃষ্টি কেড়ে নেয় বারবার। দোতলায় নারীদের জন্য সংরক্ষিত অংশে ওঠার সময় কাঠের সিঁড়িগুলো মচমচ শব্দে কেঁপে ওঠে। মনে হয়, যুগ যুগ ধরে ভার বয়ে চলা মেঝেটি হয়তো আজই হার মানবে! এ ছাড়া বিশেষভাবে নজর কাড়ে মসজিদের স্টিলের মিনারটি। দরজা খুলতেই ভেতরে দেখা যায় আদি কাঠের কাঠামো আর সর্পিল সিঁড়ি, যা বেয়ে মুয়াজ্জিন সাহেব আজান দিতে ওপরে ওঠেন।
বয়সের ছাপে পুরোনো হওয়া এই মসজিদের একপাশ একটি বিশাল স্টিলের শিট দিয়ে ঢাকা। কোনো প্রাকৃতিক ক্ষতি থেকে মুক্ত রাখতে এই উদ্যোগ। মারাল গ্রামের মানুষেরা এই কাঠের মসজিদ নিয়ে খুব চিন্তিত। গ্রীষ্মের তীব্র দহন আর শীতের কনকনে ঠান্ডা কাঠগুলোকে ক্ষয় করে দিচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, এই স্টিলের আবরণ এর আয়ু কিছুটা দীর্ঘ করবে।
স্থানীয়দের এই উদ্যোগ সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। কারণ তুরস্কের কৃষ্ণসাগর উপকূলের অন্য এলাকাগুলোতে এসব পুরোনো মসজিদের সংরক্ষণ খুব একটা গুরুত্ব পায় না। উদাহরণস্বরূপ, সামসুন শহরের এক রুটি বিক্রেতা ৩০০ বছরের পুরোনো একটি কাঠের মসজিদ কিনেছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল তা ভেঙে রুটি সেঁকার উনুনে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা!
আচ্ছা, আগামী ১০০ বছর পর কি মারাল গ্রামের এই রঙিন কাঠের মসজিদটি এভাবেই টিকে থাকবে!
সূত্র: টার্কিশ ট্রাভেল ব্লগ ডটকম