মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা। আনন্দ-উৎসবের পাশাপাশি আত্মত্যাগ, আনুগত্য ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মহিমান্বিত শিক্ষা বহন করে এ দিনটি। এর মূল ভিত্তি হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর সেই অবিস্মরণীয় ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত, যেখানে আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম (আ.)-এর প্রতি প্রিয় সন্তানকে কোরবানি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। নির্দেশ পাওয়ার পর তিনি তা বাস্তবায়নে কোনো দ্বিধা করেননি। অন্যদিকে ইসমাইল (আ.)-ও ধৈর্য ও পরিপূর্ণ আনুগত্যের পরিচয় দিয়েছিলেন।
রাসুল (সা.)-এর যুগে জিলহজের চাঁদ ওঠার পর থেকেই ঈদুল আজহার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত। সাহাবিরা এ সময় বেশি বেশি নফল ইবাদত করতেন। নিজেদের অন্তর পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করতেন। চুল ও নখ না কাটার আমলের পাবন্দি করতেন। নবীজি (সা.) জিলহজের প্রথম দশকে রোজা রাখতেন। হজরত হাফসা (রা.) বলেন, ‘নবীজি (সা.) চারটি আমল কখনো ছাড়তেন না—আশুরার রোজা, জিলহজের প্রথম দশকের রোজা, প্রতি মাসে তিনটি (আইয়ামে বিজের) রোজা এবং ফজরের দুই রাকাত সুন্নত।’ (সুনানে নাসায়ি: ২৪১৬)। তখনকার ঈদুল আজহার প্রস্তুতি বাহ্যিক আয়োজনের চেয়ে বেশি ছিল আধ্যাত্মিক ও তাকওয়াভিত্তিক।
ঈদের দিন রাসুল (সা.) ছোট-বড় সবার আনন্দের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতেন এবং বৈধ বিনোদনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করতেন। একবার ঈদের দিন আবিসিনিয়ার কিছু লোক মদিনায় লাঠিখেলা করছিল। আয়েশা (রা.) সেই খেলা দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করলে নবীজি (সা.) নিজেই তাঁকে পাশে দাঁড় করিয়ে খেলা দেখার সুযোগ করে দেন। এমনকি খেলোয়াড়দের উৎসাহও দেন।
মহানবী (সা.)-এর ঈদ উদ্যাপনে ছিল সরলতা, পরিচ্ছন্নতা, ইবাদত ও মানবিকতার অপূর্ব সমন্বয়। ঈদের দিন তিনি গোসল করতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন, খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে সুন্দর ও উত্তম পোশাক পরতেন। ঈদুল আজহায় নামাজের আগে কিছু খেতেন না। কোরবানির গোশত দিয়েই প্রথম আহার করতেন। এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যেতেন, অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসতেন। সাহাবিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন। সমাজের গরিব, অসহায় ও দুঃখী মানুষের খোঁজখবর নিতেন। ঈদের আনন্দ যেন বিত্তবানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, সে বিষয়েও বিশেষ গুরুত্বারোপ করতেন।
ঈদুল আজহার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো কোরবানি। রাসুল (সা.) নিজ হাতে কোরবানি করতেন। ঈদুল আজহার খুতবায় সাহাবিদের কোরবানির তাৎপর্য শেখাতেন। নবীজি (সা.) সাধারণত দুটি শিংওয়ালা সাদা-কালো বর্ণের বকরি কোরবানি করতেন। তবে বিদায় হজে ১০০টি উট কোরবানি করেছিলেন। কোরবানি করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতেন এবং তাকবির দিতেন। কখনো সবার সামনে ঈদগাহেই কোরবানি করতেন। কোরবানির পশু নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। ত্রুটিযুক্ত পশু কোরবানি করতে নিষেধ করেছেন। কোরবানির গোশত নিজে খেতেন। আত্মীয়, প্রতিবেশী ও গরিবদের মাঝে বণ্টন করে দিতেন।
সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন রাসুল (সা.)-এর সরাসরি শিক্ষাপ্রাপ্ত সোনালি মানুষ। ঈদুল আজহা পালনের ক্ষেত্রে তাঁরা সুন্নতের অনুসরণে অত্যন্ত সতর্ক থাকতেন। নবীজি (সা.)-এর আদেশ মোতাবেক কোরবানির পশু নির্বাচনে যত্নবান ছিলেন। অনেকে আগে থেকেই পশুর দেখাশোনা করতেন। কোরবানির পর দরিদ্রদের মাঝে গোশত বণ্টন করে দিতেন। ঈদের দিন সাহাবিরা পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় করে বলতেন—‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম।’ অর্থাৎ ‘আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের নেক আমল কবুল করুন।’
মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে সাহাবায়ে কেরাম প্রতিবছর সামর্থ্য অনুযায়ী কোরবানি করতেন। কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে সওয়াবের সুসংবাদ তাঁদের হৃদয়ে আনন্দ ও আগ্রহ সৃষ্টি করত। তাঁরা ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন, কোরবানির মূল উদ্দেশ্য আল্লাহ তাআলার প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং তাকওয়া অর্জন। তাই তাঁরা কোরবানির শিক্ষা নিজেদের জীবনাচরণে ধারণ করেছিলেন। ত্যাগ, আনুগত্য ও খোদাভীতির এই চেতনা তাঁদের প্রতিটি কাজ ও সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হতো।
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।