আপনার জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: লোকদেখানো বা বংশীয় গৌরব রক্ষার জন্য বিয়েতে বড় অঙ্কের দেনমোহর ধার্য করা কি জায়েজ? আজকাল অনেক বিয়েতে লোকদেখানো বা আভিজাত্য প্রকাশের জন্য ২০-৫০ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করা হয়, যা পরিশোধের বিষয়ে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এ দেনমোহর নির্ধারণ বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা কী?
জামিল হায়দার, সিরাজগঞ্জ
উত্তর: মানবজীবনে নারী-পুরুষের বৈধ ভালোবাসায় সিক্ত হওয়ার একমাত্র হালাল মাধ্যম হলো বিয়ে। আর এই পবিত্র বন্ধনের অন্যতম অনুষঙ্গ ও প্রধান শর্ত হচ্ছে ‘দেনমোহর’। ইসলামে দেনমোহর কেবল একটা খাতা-কলমের অঙ্ক ধরে রাখার নাম নয়, বরং এটি স্ত্রীর সুনির্দিষ্ট ও খোদাপ্রদত্ত অধিকার; যা পরিশোধ করা স্বামীর ওপর ফরজ বা অবশ্যকরণীয় কর্তব্য। দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমান সমাজে দেনমোহরের প্রকৃত গুরুত্ব ও মর্যাদা হারিয়ে একে স্রেফ একটি কাগজের রসম-রেওয়াজে পরিণত করা হয়েছে।
ইসলামি শরিয়তে বিয়ে সম্পাদনের জন্য দেনমোহর অপরিহার্য। এটি নিছক কোনো উপহার বা দান নয়, বরং স্ত্রীর অধিকার। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের থেকে যে স্বাদ গ্রহণ করো, তার বিনিময়ে অপরিহার্য ফরজ হিসেবে তাদের মোহর পরিশোধ করো।’ (সুরা নিসা: ২৪)
ইসলামে দেনমোহরের সর্বোচ্চ কোনো সীমা নেই। স্বামীর সামর্থ্য, স্ত্রীর সামাজিক মর্যাদা ও পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে এটি নির্ধারিত হয়। তবে হানাফি মাজহাবের মতে, দেনমোহরের একটি সর্বনিম্ন সীমা রয়েছে। তা হলো ১০ দিরহাম, যা বর্তমান হিসাবে প্রায় ৩০.৬১৮ গ্রাম রুপা বা এর সমপরিমাণ অর্থ। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘১০ দিরহামের কম কোনো মোহর নেই।’ (সুনানে বায়হাকি)
সামর্থ্যবান স্বামী হলে স্ত্রীকে বেশি পরিমাণে মোহর দিতে পারেন, এতে ইসলামের কোনো আপত্তি নেই। তবে তা যেন কোনোভাবেই লোকদেখানো বা সামাজিক অহংকার প্রদর্শনের (রিয়া) জন্য না হয়।
আজকাল অনেক বিয়েতে লোকদেখানো বা আভিজাত্য প্রকাশের জন্য অলীক অঙ্কের (যেমন ২০ বা ৫০ লাখ টাকা) দেনমোহর ধার্য করা হয়, যা পরিশোধের সামর্থ্য বা নিয়ত বরের থাকেই না। ইসলামে এই প্রবণতাকে মারাত্মক গুনাহের কাজ বলে হুঁশিয়ার করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো একটা পরিমাণ মোহরানা ধার্য করে কোনো নারীকে বিয়ে করল, অথচ আল্লাহ জানেন যে তা পরিশোধ করার ইচ্ছে তার নেই; এ ব্যক্তি আল্লাহর নামে তার স্ত্রীকে প্রতারিত করল এবং অন্যায়ভাবে তার সতীত্ব নিজের জন্য হালাল মনে করে ভোগ করল। এমন ব্যক্তি কিয়ামতের দিন ‘জিনাকারী বা ব্যভিচারী’ হিসেবে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে।’ (মুসনাদে আহমদ)
জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগে মোহরানা নিয়ে কনেপক্ষ ও বরপক্ষের মধ্যে তুমুল দর-কষাকষি হতো এবং লোকদেখানো বড় অঙ্ক ধার্য করে পরবর্তী সময়ে ঝগড়া-বিবাদ তৈরি হতো। বর্তমান আধুনিক সমাজেও সেই জাহেলি সংস্কৃতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। দেনমোহর নিয়ে কড়াকড়ি কিংবা বরপক্ষকে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া ইসলাম সমর্থন করে না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম পরিমাণের মোহর হচ্ছে তা, যা পরিশোধ করা সহজসাধ্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘নিশ্চয় বরকতের দিক দিয়ে সর্বোত্তম ও গ্রহণযোগ্য বিয়ে হলো তা, যা সবচেয়ে স্বল্প খরচে সম্পাদিত হয়।’ (সুনানে বায়হাকি, শুআবুল ইমান)
বিয়ে হলো একটি পবিত্র মানবিক ও নৈতিক সম্পর্কের যোগসূত্র, যা মানুষের চরিত্র হেফাজতের উত্তম প্রতিষেধক। তাই এই শান্তির সমাজ বিনির্মাণে আমাদের উচিত দেনমোহরের বেলায় অবাস্তব কড়াকড়ি আরোপ না করে, সামর্থ্য অনুযায়ী তা নির্ধারণ করা। একই সঙ্গে বিয়ের পর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত স্ত্রীর প্রাপ্য মোহর বুঝিয়ে দিয়ে দাম্পত্য জীবনকে বরকতময় ও সুখী করে তোলা প্রতিটি মুসলিম পুরুষের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
উত্তর দিয়েছেন, মুফতি শাব্বির আহমদ, ইসলামবিষয়ক গবেষক