পবিত্র রমজান মাস এলেই মুদিদোকান বা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ‘বাকির খাতা’ কিনে নেওয়া এবং অভাবী মানুষের অজান্তেই তাদের ঋণ পরিশোধ করে দেওয়ার এক প্রাচীন উসমানীয় (অটোমান) ঐতিহ্য পুনরায় প্রাণ ফিরে পায়। একে আরবিতে বলা হয় ‘দাফাতিরুদ দাইন’ বা ঋণের খাতা পরিশোধ।
এই রীতিটি ‘দাফাতিরুল খায়ের’ অর্থাৎ কল্যাণের নথি নামেও পরিচিত। এটি একটি মানবিক উদ্যোগ, যা পারস্পরিক সংহতি ও সহমর্মিতার বহিঃপ্রকাশ। এই মহৎ কাজে বিত্তবানেরা গোপনে দরিদ্রদের ঋণ পরিশোধ করেন, যা পবিত্র মাসে তাদের আর্থিক বোঝা লাঘব করে।
কীভাবে পালিত হতো এই রীতি?
তৎকালীন ধনী ও দানশীল ব্যক্তিরা দরিদ্র মহল্লার দোকান বা মুদিখানায় যেতেন এবং বাকির খাতাটি দেখতে চাইতেন। এরপর তাঁরা খাতার নামগুলো দেখে, ঋণের টাকা পুরোটা অথবা আংশিক পরিশোধ করে দিতেন। সবশেষে দোকানদারকে নির্দেশ দিতেন সেই ঋণের পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেলতে। এই পদ্ধতির আশ্চর্য অধ্যায় হলো, যিনি ঋণ শোধ করছেন এবং যাঁর ঋণ শোধ হচ্ছে—উভয় পক্ষই একে অপরের পরিচয় জানতেন না। মূলত ঋণগ্রহীতার আত্মসম্মান রক্ষা করতেই এই গোপনীয়তা বজায় রাখা হতো।
এই ঐতিহ্যের উদ্দেশ্য
এই প্রথাটি উসমানীয় সাম্রাজ্যে প্রচলিত সামাজিক সংহতির এক অনন্য উদাহরণ। এর লক্ষ্য ছিল বিত্তবানেরা যেন অভাবীদের সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দেয় এমনভাবে, যাতে সেখানে দয়া দেখানোর দম্ভ বা গ্রহীতার জন্য কোনো সংকোচ না থাকে। বিশেষ করে রহমত ও বরকতের মাস রমজানে মানুষের আর্থিক কষ্ট দূর করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।
ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণ
আজকের তুরস্কেও অনেক নাগরিক রমজান মাসে এই উসমানীয় ঐতিহ্যটি পরম যত্নে পালন করেন। একে বলা হয় ‘শাতবু দাফতারিজ্জিমাম’ অর্থাৎ দায়দেনার খাতা মুছে ফেলা বা ‘দাফতারুদ দুয়ুন’ অর্থাৎ দেনার নথি। দানশীল ব্যক্তিরা দোকানগুলোতে গিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর নামে থাকা বকেয়া পরিশোধ করে দিয়ে উদারতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
আরব বিশ্বের চিত্র
আধুনিক পদ্ধতিতে হলেও আরব ও মুসলিম দেশগুলোতে এই রীতি আজও টিকে আছে। সিরিয়ায় সামাজিক সংহতির অংশ হিসেবে অভাবী পরিবারগুলোকে খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি অনেক ব্যবসায়ী রমজানে কিস্তি বা বকেয়া পরিশোধের সময় পিছিয়ে দেন অথবা বিশেষ ছাড় দেন।
জর্ডানেও এই ঐতিহ্যের এক অভাবনীয় রূপ দেখা যায়। সেখানে কিছু ব্যবসায়ী ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাঁদের ‘বাকির খাতা’ পুড়িয়ে ফেলেছেন এবং গ্রাহকদের সমস্ত ঋণ মওকুফ করে দেন।
এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত
জর্ডানের নাগরিক মোহাম্মদ তাবাঞ্জা একটি অসাধারণ মানবিক উদাহরণ তৈরি করেছেন। তিনি তাঁর গ্রাহকদের কাছে পাওনা প্রায় ৩০ হাজার জর্ডানি দিনার (প্রায় ৪৬ লাখ টাকা) মূল্যের ঋণের খাতা পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। রমজান মাসে মানুষের ওপর থেকে আর্থিক চাপ কমাতেই তিনি এই পদক্ষেপ নেন। তাঁর এই মহৎ কাজটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে এবং অন্যদেরও ক্ষমা ও ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হতে অনুপ্রাণিত করে।
সূত্র: আল জাজিরা