হজ কোনো সাধারণ সফর নয়, এটি মহান আল্লাহর সান্নিধ্যলাভের এক অনন্য মাধ্যম। এই ইবাদত যেমন শরীরের পরিশ্রমে ঋদ্ধ, তেমনি আত্মার প্রশান্তিতে ধন্য। তবে প্রস্তুতির অভাবে অনেক সময় এই পবিত্র সফর কেবল ভ্রমণে পর্যবসিত হয়। তাই হজে যাওয়ার আগে প্রতিটি হাজিকে কিছু মৌলিক বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে হয়।
হজের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো বিশুদ্ধ নিয়ত। আপনার হজের উদ্দেশ্য যেন কেবলই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হয়। লোকদেখানো মনোভাব, সামাজিক মর্যাদা বা বর্তমান সময়ের ‘সেলফি সংস্কৃতি’ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা জরুরি। মনে রাখবেন, সব আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। ছবি তুলে বাহবা পাওয়ার চেয়ে আল্লাহর কাছে কবুল হজের মর্যাদা অনেক বেশি।
হজের ফরজ, ওয়াজিব এবং সুন্নতগুলো না জেনে হজে যাওয়া অন্ধের মতো হাঁটার শামিল। ইহরাম বাঁধার নিয়ম, তাওয়াফ, সায়ি, মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফার আমলগুলো অভিজ্ঞ আলেমদের থেকে বা নির্ভরযোগ্য বই পড়ে শিখে নিন। বর্তমান ডিজিটাল যুগে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ভিডিও ও সেমিনার এ ক্ষেত্রে দারুণ সহায়ক হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র, তাই তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না। হজের পুরো খরচ যেন হালাল উপার্জন থেকে হয়, সেদিকে কঠোর নজর দিন। পাশাপাশি নিবন্ধিত হজ এজেন্সির মাধ্যমে পাসপোর্ট, ভিসা, টিকা, স্বাস্থ্য সার্টিফিকেটসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র আগেভাগেই প্রস্তুত রাখুন।
হজে যাওয়ার আগে বিগত জীবনের সব পাপ থেকে খাঁটি তওবা করুন। মানুষের কোনো পাওনা বা ‘হক্কুল ইবাদ’ থাকলে তা পরিশোধ করুন। কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা চেয়ে নিন। আল্লাহর ঘরে যাওয়ার আগে মনকে হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত করা অপরিহার্য।
হজ একটি কষ্টসাধ্য ইবাদত। প্রচণ্ড গরম, জনসমুদ্র এবং দীর্ঘ অপেক্ষার সময় মেজাজ হারানো স্বাভাবিক। তাই আগে থেকেই ধৈর্য ও সহনশীলতার চর্চা করুন। অসুস্থতা এড়াতে প্রয়োজনীয় ওষুধ, ব্যক্তিগত হাইজিন সামগ্রী এবং আরামদায়ক পোশাক সঙ্গে রাখুন।
বর্তমান সময়ে পবিত্র কাবা শরিফ বা মদিনার রওজাপাকের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলা বা ফেসবুক লাইভ করা একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। ইবাদতের সময় ক্যামেরায় মগ্ন থাকা ইখলাস ও খুশুখুজু (একাগ্রতা) নষ্ট করে দেয়। হাদিসে ‘রিয়া’ বা লোকদেখানো ইবাদতকে ‘ছোট শিরক’ বলা হয়েছে। তাই আপনার হজকে প্রদর্শনী নয়, বরং একান্তই আল্লাহর জন্য নিবেদিত করুন।
যদি কারও ওপর হজ ফরজ হয় কিন্তু তিনি স্থায়ীভাবে শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন, তবে তাঁর জন্য ইসলামে ‘বদলি হজ’-এর বিধান রয়েছে।
ক. যিনি বদলি হজ করবেন, তাঁকে ইতিপূর্বে নিজের ফরজ হজ আদায় করা থাকতে হবে।
খ. অসুস্থ ব্যক্তির পক্ষ থেকে প্রেরিত ব্যক্তি ইহরামের সময় স্পষ্টভাবে তাঁর নাম উচ্চারণ করে নিয়ত করবেন।
গ. অসুস্থ ব্যক্তির সম্পদ থেকেই হজের যাবতীয় খরচ নির্বাহ করতে হবে।
ঘ. যদি বদলি হজ করানোর পর ওই ব্যক্তি অলৌকিকভাবে সুস্থ হয়ে যান এবং হজে যাওয়ার ক্ষমতা ফিরে পান, তবে তাঁকে পুনরায় সশরীরে হজ করতে হবে।
তাই ইসলামবিষয়ক বিশেষজ্ঞগণ পরামর্শ দিয়ে থাকেন, যদি সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে তড়িঘড়ি বদলি হজ না করিয়ে অপেক্ষা করাই শ্রেয়। সুস্থ না হলে মৃত্যুর আগে ‘অসিয়ত’ করে যাওয়া ওয়ারিশদের ওপর আবশ্যক।
পবিত্র সফরের পথে কোনো কারণে (যেমন: অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা আইনি বাধা) যদি হজে যেতে বাধাপ্রাপ্ত হন, তবে ইসলামি পরিভাষায় একে ‘ইহসার’ বলা হয়।
ইহরাম বাঁধার পর যেকোনো কারণে বাধাপ্রাপ্ত হলে তাঁকে দমে ইহসার বা পশু কোরবানি করতে হবে। যতক্ষণ ওই পশু হারামে কোরবানি না হবে, ততক্ষণ ইহরাম ত্যাগ করা যাবে না। পরে সুযোগ হলে ওই হজ বা ওমরাহ পুনরায় কাজা করতে হবে।
ঐতিহাসিক হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় রাসুল (সা.) ও সাহাবিগণ মক্কার কাফেরদের বাধার মুখে পড়েছিলেন। তখন আল্লাহর নির্দেশে তাঁরা কোরবানি করে মাথা মুণ্ডন করে ইহরাম ত্যাগ করেছিলেন।
হজ থেকে ফেরার পর একজন হাজি যেন নিষ্পাপ শিশুর মতো পবিত্র হয়ে ফেরেন। এই পবিত্রতা ধরে রাখাই হলো হজের সার্থকতা। হজের পর নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, হালাল রুজি এবং ইসলামের দাওয়াতি কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখার পরিকল্পনা নিয়ে দেশে ফিরুন।
হজ কেবল মক্কা-মদিনার সফর নয়, এটি জান্নাতের পথে এক মহাসফর। নিয়তের বিশুদ্ধতা, সঠিক ইলম এবং সবর বা ধৈর্যের মাধ্যমে যদি প্রস্তুতি নেওয়া যায়, তবে ইনশা আল্লাহ আপনার হজ হবে কবুল ও ফলপ্রসূ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে মাবরুর হজ নসিব করুন।