সুরা ইয়াসিন পবিত্র কোরআনের ৩৬তম সুরা। এই সুরাকে পবিত্র কোরআনের হৃৎপিণ্ড বলা হয়। ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসসমূহ, যেমন তাওহিদ, রিসালাত এবং পরকাল সম্পর্কে এই সুরায় অত্যন্ত শক্তিশালী ও ছন্দময় ভাষায় আলোচনা করা হয়েছে। মক্কায় অবতীর্ণ এই সুরাটির আয়াত সংখ্যা ৮৩ এবং রুকু সংখ্যা ৫।
সুরা ইয়াসিনের বিশেষ ৫ ফজিলত
হাদিস ও সালফে সালেহিনদের বর্ণনা অনুযায়ী সুরা ইয়াসিনের মাহাত্ম্য অপরিসীম। নিচে এর প্রধান কিছু ফজিলত তুলে ধরা হলো:
- ১. কোরআনের হৃৎপিণ্ড: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘সবকিছুরই একটি হৃদয় থাকে, আর কোরআনের হৃদয় হলো সুরা ইয়াসিন।’ (জামে তিরমিজি: ২৮৮৭)। যেমন শরীরের সকল কাজ হৃদ্যন্ত্রের ওপর নির্ভর করে, তেমনি কোরআনের মূল নির্যাস এই সুরায় বিদ্যমান।
- ২. দশবার কোরআন খতমের সওয়াব: হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি একবার সুরা ইয়াসিন পাঠ করবে, আল্লাহ তার আমলনামায় দশবার পূর্ণ কোরআন পড়ার নেকি দান করবেন। (জামে তিরমিজি: ২৮৮৭)
- ৩. গুনাহ মাফের মাধ্যম: হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রাতে সুরা ইয়াসিন পাঠ করবে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন।’
- ৪. মৃত্যুর যন্ত্রণা লাঘব: মুমূর্ষু ব্যক্তির শিয়রে সুরা ইয়াসিন পাঠ করা মুস্তাহাব। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মুমূর্ষু ব্যক্তিদের নিকট সুরা ইয়াসিন পাঠ করো।’ (সুনানে আবু দাউদ। এতে মৃত্যু যন্ত্রণা সহজ হয় এবং রুহ বের হওয়ার সময় শান্তি অর্জিত হয়। (তাফসিরে মাজহারি)
- ৫. মনের আশা ও হাজত পূরণ: হজরত আতা বিন আবি রাবাহ (রা.) বর্ণিত হাদিসে আছে, ‘যে ব্যক্তি দিনের শুরুতে সুরা ইয়াসিন পাঠ করবে, তার সব হাজত (প্রয়োজন) পূর্ণ করা হবে।’ (সুনানে দারেমি: ৩৪৬১)
ইয়া সিন শব্দের অর্থ ও ব্যাখ্যা
অনেকে এর অর্থ ‘হে ব্যক্তি!’ বা ‘হে মানুষ!’ বলেছেন। আবার কারও মতে এটি নবী করিম (সা.)-এর অন্যতম নাম, কেউ কেউ একে আল্লাহ তাআলার সুন্দরতম নামগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেছেন। তবে এই মতগুলোর সপক্ষে কোনো জোরালো প্রমাণ নেই। প্রকৃতপক্ষে এটি পবিত্র কোরআনের সেই ‘হুরুফে মুকাত্তাআত’ বা বিচ্ছিন্ন অক্ষরসমূহের অন্তর্ভুক্ত, যার প্রকৃত রহস্য বা অর্থ আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না। (তাফসিরে বাগাভি, তাফসিরে তাবারি, তাফসিরে আহসানুল বায়ান)
সুরা ইয়াসিনের বিষয়বস্তু ও পটভূমি
এই সুরায় মহান আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও জাগতিক নিদর্শনের মাধ্যমে নিজের সার্বভৌমত্ব তুলে ধরেছেন:
- রাসুল (সা.)-এর রিসালাত: সুরার শুরুতে আল্লাহ তাআলা কোরআনের শপথ করে মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়াতের সত্যতা ঘোষণা করেছেন।
- হাবিবে নাজ্জারের কাহিনি: এই সুরায় এমন এক জনপদের কাহিনি আছে যারা তিনজন নবীকে অস্বীকার করেছিল। তখন হাবিবে নাজ্জার নামক এক ব্যক্তি ইমান এনে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন। তাঁর শাহাদাত ও জান্নাতে প্রবেশের ঘটনা মুমিনদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা।
- প্রকৃতির নিদর্শন: বৃষ্টি, মৃত ভূমি সজীব হওয়া, দিন-রাত্রির পরিবর্তন এবং চন্দ্র-সূর্যের কক্ষপথের শৃঙ্খলার মাধ্যমে আল্লাহর কুদরতের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
- কিয়ামত ও পুনরুত্থান: কিয়ামতের বিভীষিকা, শিঙায় ফুৎকার এবং হাশরের ময়দানে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়টি এখানে বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে।
সুরা ইয়াসিনের আমল
- সকালে পাঠ: সারা দিন শান্তিতে ও স্বস্তিতে থাকার জন্য সকালে পাঠ করা উত্তম।
- রাতে পাঠ: গুনাহ মাফ ও নিষ্পাপ অবস্থায় ঘুম থেকে ওঠার জন্য রাতে পাঠ করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
- মুখস্থ করা: এটি খুব দীর্ঘ সুরা নয় এবং এর আয়াতগুলো ছন্দময় হওয়ায় ৫-১০ দিনের প্রচেষ্টায় এটি মুখস্থ করা সম্ভব। এটি আপনার ইমানকে মজবুত করবে।
সুরা ইয়াসিন সওয়াব অর্জনের মাধ্যম, জীবনদর্শন পরিবর্তনের শক্তিশালী মাধ্যম। নিয়মিত অর্থসহ এই সুরাটি তিলাওয়াত করলে ইহকাল ও পরকালে শান্তি ও বরকত লাভ করা সম্ভব।