উত্তর আফ্রিকার সাগরপারের দেশ মরক্কো। আটলান্টিক মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরের মিলনসীমায় দাঁড়িয়ে থাকা এই ভূখণ্ডটি ইসলামি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অনন্য উপাখ্যান বুকে ধারণ করে আছে। আরবি ভাষায় এই অঞ্চলকে বলা হয় ‘আল-মাগরিব’, যার অর্থ ‘পশ্চিমের রাজ্য’ বা ‘দূরতম পশ্চিম’। খ্রিষ্টপূর্ব আট হাজার বছর আগে থেকে শুরু করে বারবার, ফোনেশীয়, ইহুদি, রোমান, ভেন্ডাল ও বাইজেন্টাইনদের পদচারণে মুখর এই ভূমিতে ইসলামের আগমন এবং মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবময় ও বৈচিত্র্যপূর্ণ।
সপ্তম শতকে রোমানরা আফ্রিকান অঞ্চল থেকে সরে যাওয়ার পর পূর্ব জার্মান বংশোদ্ভূত ভেন্ডাল এবং পরবর্তী সময়ে গ্রিক বাইজেন্টাইনরা পর্যায়ক্রমে এই অঞ্চল শাসন করে। খোলাফায়ে রাশেদার শাসনকাল শেষ হওয়ার পর উমাইয়া খিলাফতের হাল ধরেন সাহাবি মুয়াবিয়া (রা.)। তিনি সমগ্র মুসলিম রাষ্ট্রকে ১০টি সুনির্দিষ্ট প্রদেশে বিভক্ত করে প্রতিটি অঞ্চলের জন্য পৃথক শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। এই ধারাবাহিকতায় তিনি মিসরের শাসনভার অর্পণ করেন সাহাবি আমর ইবনে আস (রা.)-এর ওপর এবং সামগ্রিক উত্তর আফ্রিকার দায়িত্ব দেন বিখ্যাত মুসলিম বিজেতা সাহাবি উকবা ইবনে নাফে (রা.)-এর ওপর।
ঠিক এই সময়েই রোমক বা বাইজেন্টাইন শাসকেরা উত্তর আফ্রিকার বেশ কিছু অঞ্চল পুনর্দখল করে নেয়। তারা স্থানীয় আদিবাসী ‘বারবার’ জনগোষ্ঠীর ওপর চরম অত্যাচার ও নিপীড়ন শুরু করে। রোমানদের এই বর্বরতায় অতিষ্ঠ হয়ে স্থানীয় বারবাররা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে এবং সাহায্যের আশায় নিকটবর্তী মিসরের মুসলিম শাসনকর্তা আমর ইবনে আস (রা.)-এর কাছে দূত পাঠায়।
বারবারদের এই করুণ আর্তনাদ ও রোমানদের অত্যাচারের বিবরণ শুনে চরম ব্যথিত হন খলিফা মুয়াবিয়া (রা.)। তিনি কালক্ষেপণ না করে সেনাপতি হজরত উকবা ইবনে নাফে (রা.)-এর নেতৃত্বে ১০ হাজার সৈন্যের একটি শক্তিশালী ও সুসজ্জিত বাহিনী আফ্রিকায় প্রেরণ করেন।
হজরত উকবা ইবনে নাফে (রা.) তাঁর রণকৌশল ও সাহসিকতা দিয়ে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা ও রোমানদের প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেন। ফলে, ৬৮৩ খ্রিষ্টাব্দে তাঁরই বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্বে মরক্কোর ভূমিতে প্রথম ইসলামের বিজয়ী পতাকা ওড়ে এবং মুসলিম শাসনের সূচনা হয়।
বৃহত্তর ইসলামি সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে মরক্কো প্রাথমিকভাবে উমাইয়া খিলাফতের অধীনে ‘ইফ্রিকিয়া’ প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং কেন্দ্র থেকে নির্ধারিত গভর্নর কর্তৃক শাসিত হতে থাকে। মরক্কো বিজয়ের পর মুসলিম শাসকেরা স্থানীয় বারবারদের ওপর কোনো কর চাপানো বা জোরপূর্বক ধর্মান্তরের পথ বেছে নেননি। মুসলিম কিংবা অমুসলিম ঐতিহাসিক—কোনো সূত্রেই বারবারদের জোরপূর্বক ইসলামে দীক্ষিত করার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।
প্রকৃতপক্ষে, মুসলমান প্রশাসনের ন্যায়বিচার, সাম্য, মানবিকতা এবং ইসলামের সহজ-সরল রীতিনীতি দেখে বারবার উপজাতিরা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়। তারা সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে। পরে এই বারবার জনগোষ্ঠীর ব্যাপক আকারে ইসলাম গ্রহণ সমগ্র মুসলিম বিশ্বের শক্তিকে এক নতুন প্রাণ দেয়। ইসলাম এখানে যাযাবর ও গোত্রভিত্তিক জীবনধারাকে বদলে দিয়ে একটি উন্নত সংস্কৃতি, পরিমার্জিত জীবনাচরণ এবং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার জন্ম দেয়।
মরক্কোর ইসলামি ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় হলো জ্ঞানচর্চা। ৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে মরক্কোর ফেস শহরে ফাতিমা আল-ফিহরি নামের এক দূরদর্শী মুসলিম নারীর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘আল-কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়’। এটি বিশ্বের ইতিহাসে প্রাচীনতম ও ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়া বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম পরিব্রাজক ইবনে বতুতার জন্মও এই মরক্কোর তাঞ্জিয়ার শহরে, যিনি তাঁর বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনি ‘আর রিহলা’র জন্য অমর হয়ে আছেন।
লাইফ ইন মরক্কো অবলম্বনে