একটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল এবং ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনে শাসকের ভূমিকা অপরিসীম। মানুষের চিন্তা-চেতনা ও স্বভাবে ভিন্নতা থাকার কারণে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছাড়া সমাজে বিশৃঙ্খলা ও সংঘর্ষ ঘটা স্বাভাবিক। ইসলামে শাসনক্ষমতা ভোগের বস্তু নয়—এটি একটি পবিত্র আমানত এবং বিশাল দায়িত্ব। কিয়ামতের দিন প্রত্যেক শাসককে তার অধীনদের বিষয়ে মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
জনতার জানমালের নিরাপত্তা
ইসলামি শরিয়তে শাসকের প্রধান কর্তব্য হলো জনগণের জানমাল এবং ইজ্জতের হেফাজত করা। নবী করিম (সা.) এ দায়িত্বের গুরুত্ব এবং অবহেলার ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল, আর প্রত্যেককেই তার অধীনদের (দায়িত্ব) সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। যেমন জনগণের শাসক তাদের দায়িত্বশীল, তাকে তার প্রজাসাধারণের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের অভিভাবক ও দায়িত্বশীল, তাকে তার পরিবার-পরিজনদের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হবে। স্ত্রী তার স্বামীর ঘর এবং সন্তানদের রক্ষণাবেক্ষণকারী ও দায়িত্বশীল, তাকে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হবে। এমনকি একজন দাসও তার মালিকের সম্পদের জিম্মাদার, তাকেও সে সম্পদের বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে। অতএব জেনে রেখো! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই নিজ নিজ অধীনদের বিষয়ে জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে।’ (সহিহ বুখারি: ২৫৫৪)
অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা
জনগণের মৌলিক চাহিদা মেটানো এবং অর্থনৈতিক সাম্য বজায় রাখা শাসকের অন্যতম কাজ। অবৈধ আয় রোধ, সুদ-ঘুষ নির্মূল, মজুতদারি ও কালোবাজারি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং বাজারে গিয়ে খাদ্যে ভেজাল বা ধোঁকাবাজি হচ্ছে কি না তা তদারকি করতেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, ‘যে ব্যক্তি ধোঁকাবাজি করে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।’
এ ছাড়া জাকাত ব্যবস্থাপনা এবং উত্তরাধিকার আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করা শাসকের কর্তব্য।
জনসম্পৃক্ততা ও পরামর্শ
ইসলামি শাসনব্যবস্থার অন্যতম মূলনীতি হলো পরামর্শ। শাসক একা স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত নেবেন না, বরং যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিদের পরামর্শ গ্রহণ করবেন।
শাসকের স্বভাব হতে হবে কোমল ও ক্ষমাশীল। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনি যদি উগ্র স্বভাব ও পাষাণ হৃদয়ের অধিকারী হতেন, তবে এসব লোক আপনার চারপাশ থেকে দূরে সরে যেত।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৫৯)
শাসকের সঙ্গে নাগরিকদের সরাসরি কথা বলার সুযোগ থাকতে হবে। খলিফা ওমর (রা.)-এর যুগে কোনো গভর্নর যদি জনসাধারণের সঙ্গে আড়াল তৈরি করতেন, তবে তাঁকে তৎক্ষণাৎ জবাবদিহির আওতায় আনা হতো।
ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতা
যাঁরা সততার সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, আখিরাতে তাঁদের জন্য রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। কিয়ামতের কঠিন দিনে যে সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া পাবেন, তাদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি হলেন ন্যায়পরায়ণ শাসক। ইনসাফকারী শাসকেরা আল্লাহর ডান পাশে নুরের বা দ্যুতিময় মিম্বরের ওপর অবস্থান করবেন।
স্বৈরাচার ও খেয়ানতের পরিণতি
ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জনগণের প্রতি জুলুমের পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি মুসলিম জনসাধারণের দায়িত্ব লাভ করল আর তার মৃত্যু হলো এই অবস্থায় যে, সে ছিল খেয়ানতকারী, তাহলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন।’ (সহিহ বুখারি: ৭১৫১)। শাসক যখন জুলুম শুরু করে, তখন তার ওপর থেকে আল্লাহর সাহায্য উঠে যায় এবং শয়তান তাকে গ্রাস করে।
আদর্শ শাসকের উদাহরণ
ইসলামি ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ শাসকের উদাহরণ দিতে গেলে খলিফা ওমর (রা.)-এর নাম সবার আগে আসে। তাঁর শাসনের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল: এক. নিজে দায়িত্ব পালন: তিনি গভীর রাতে মদিনার অলিগলিতে ঘুরে বেড়াতেন মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখার জন্য। নিজের কাঁধে খাদ্যের বস্তা বহন করে ক্ষুধার্তের ঘরে পৌঁছে দিতেন। দুই. জবাবদিহির ভয়: তিনি বলতেন, ‘যদি ফোরাত নদীর কিনারায় কোনো কুকুরও না খেয়ে মরে, তবে তার জন্য ওমরকে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে।’ তিন. অমুসলিমদের অধিকার: তাঁর শাসনামলে অমুসলিম নাগরিকেরা পূর্ণ নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার পেতেন।
শাসকের প্রধান কিছু দায়িত্ব
১. আল্লাহর বিধান কার্যকর করা।
২. সুবিচার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
৩. নামাজ ও জাকাত ব্যবস্থার তদারকি।
৪. যোগ্য ব্যক্তিদের প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেওয়া।
৫. জনগণের অভাব-অভিযোগ সরাসরি শোনা।
৬. দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি রোধ করা।
৭. প্রতিবন্ধী ও অসহায়দের সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়া।
৮. জনস্বার্থে পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
৯. শিক্ষা ও উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা।
১০. নিজের নৈতিকতা ও আমানতদারি বজায় রাখা।
শাসনক্ষমতা মানেই বড় আমানত। একজন সফল শাসক তিনি, যিনি জনগণের সেবক (খাদেম) হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারেন। ইসলামের এই ইনসাফভিত্তিক শাসননীতি অনুসরণের মাধ্যমেই পৃথিবীতে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।