বছরের ১২ মাসের মধ্যে মাহে রমজানের মাহাত্ম্য ও মর্যাদা অতুলনীয়। মুমিনের কাছে রমজান মানেই রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এক বিশেষ সুযোগ। হাদিস শরিফে সিয়াম বা রোজা পালনকারীদের জন্য এমন কিছু বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা অন্য কোনো ইবাদতের ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না।
রোজার ফজিলত সম্পর্কে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ও সহিহ হাদিস নিচে তুলে ধরা হলো:
১. রোজার প্রতিদান স্বয়ং আল্লাহ দেবেন
সাধারণত প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব নির্দিষ্ট থাকে; কিন্তু রোজার বিষয়টি ভিন্ন। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘রোজা আমারই জন্য, আর আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।’ (সহিহ বুখারি: ১৮৯৪)
২. জান্নাতের আর-রাইয়ান দরজা
রোজাদারদের সম্মান জানাতে জান্নাতে একটি বিশেষ প্রবেশদ্বার থাকবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই জান্নাতে “আর-রাইয়ান” নামে একটি দরজা আছে, যা দিয়ে কিয়ামতের দিন কেবল রোজাদারেরাই প্রবেশ করবে।’ (সহিহ বুখারি: ১৮৯৬)
৩. জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢাল
যুদ্ধক্ষেত্রে ঢাল যেমন শত্রুর আঘাত থেকে রক্ষা করে, রোজা তেমনি জাহান্নামের আগুন থেকে মুমিনকে রক্ষা করবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রোজা হলো জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢাল।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৬৩৯)
৪. জান্নাত লাভের মাধ্যম
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখা জান্নাতে প্রবেশের পথ সুগম করে। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় একদিন রোজা রাখবে এবং ওই অবস্থায় তার মৃত্যু হবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (মুসনাদে আহমদ: ২৩৩২৪)
৫. কিয়ামতে রোজার সুপারিশ
কিয়ামতের কঠিন ময়দানে রোজা বান্দার জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, ‘হে আল্লাহ, আমি তাকে দিনের বেলায় পানাহার থেকে বিরত রেখেছিলাম, তাই তার জন্য আমার সুপারিশ কবুল করুন।’ (মুসনাদে আহমদ)
৬. গুনাহ মাফের সুযোগ
রমজানের রোজা গুনাহ থেকে পবিত্র হওয়ার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখবে, তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি: ৩৮)
৭. পাপের কাফফারা
মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পরিবার, সম্পদ ও প্রতিবেশীর মাধ্যমে যেসব ছোটখাটো ফিতনা বা গুনাহ হয়, রোজা সেগুলোর কাফফারা হিসেবে কাজ করে। (সহিহ বুখারি: ৫২৫)
৮. রোজাদারের মর্যাদা
দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার ফলে রোজাদারের মুখে যে ঘ্রাণ সৃষ্টি হয়, তা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। হাদিসে এসেছে, ‘রোজাদারের মুখের ঘ্রাণ আল্লাহর কাছে মিশক বা মৃগনাভির সুগন্ধির চেয়েও বেশি উৎকৃষ্ট।’ (সহিহ বুখারি: ১৯০৪)
৯. দোয়া কবুলের সুযোগ
রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান, তবে ইফতারের আগের সময়টি দোয়া কবুলের জন্য বিশেষভাবে নির্ধারিত। হাদিসে এসেছে, ‘ইফতারের সময় রোজাদার যখন দোয়া করে, তখন তার দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৭৫৩)
১০. জান্নাতের দরজা উন্মোচন
রমজান মাস শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি হয়। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যখন রমজান মাস আসে, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শিকলবন্দী করা হয়।’ (সহিহ বুখারি: ৭৭৮)
উল্লিখিত হাদিসগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সঠিকভাবে রোজা পালনের মাধ্যমে আমরা যেমন দুনিয়ায় প্রশান্তি পেতে পারি, তেমনি আখিরাতেও বিশাল পুরস্কার লাভ করতে পারি।
লেখক: খতিব, মুহাদ্দিস ও গবেষক