ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। এটি আল্লাহ তাআলার নিকট বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ মাসগুলোর অন্যতম। ইসলামের ইতিহাসে মহররমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, বিশেষ করে আশুরা ও কারবালার স্মৃতি। এসব ঘটনা মুসলমানদের জন্য শিক্ষা, অনুপ্রেরণা এবং জীবন পরিচালনার দিকনির্দেশনা বহন করে। মহররমের গুরুত্বপূর্ণ ৫ শিক্ষা হলো—
জীবনকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করার সুযোগ এনে দেয় মহররম। একটি বছরের অবসান এবং নতুন বছরের সূচনা স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমাদের জীবন থেকে আরও একটি বছর বিদায় নিয়েছে এবং আমরা চূড়ান্ত গন্তব্যের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছি। একজন সচেতন মুমিন এ সময় বিগত বছরের আমল, সফলতা ও ব্যর্থতার হিসাব নেয়, নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং ভবিষ্যতে আরও সুন্দর ও কল্যাণকর জীবন গড়ার প্রত্যয় গ্রহণ করে।
মহররম মাস আমাদের আল্লাহর আদেশের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের শিক্ষা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ মাসকে ‘শাহরুল্লাহ’ (আল্লাহর মাস) বলে অভিহিত করেছেন, যা এর বিশেষ মর্যাদা ও ফজিলতের প্রমাণ। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩) একজন মুমিন যখন উপলব্ধি করবে যে কোনো মাসকে আল্লাহ তাআলা নিজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে সম্মানিত করেছেন, তখন তাঁর হৃদয়ে এ মাসের প্রতি শ্রদ্ধা ও ইবাদতের আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পাবে। তাই মহররম আমাদের বেশি বেশি নফল রোজা, তওবা, ইস্তিগফার, জিকির এবং অন্যান্য নেক আমলে আত্মনিয়োগের আহ্বান জানায়।
মহররম মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো সত্য ও ন্যায়ের পথে দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকা। কারবালার ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে এমন এক অধ্যায়, যা যুগে যুগে মানুষকে আদর্শের জন্য ত্যাগ স্বীকারের প্রেরণা দিয়ে আসছে। হজরত হোসাইন (রা.) এমন একসময়ে সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা ছিল অত্যন্ত কঠিন। তিনি পার্থিব স্বার্থ, নিরাপত্তা কিংবা ক্ষমতার লোভে নিজের নীতি ও আদর্শের সঙ্গে আপস করেননি। কারণ, একজন মুমিনের প্রকৃত মর্যাদা সত্যের ওপর অবিচল থাকার মধ্যে নিহিত। জীবনের যেকোনো পরিস্থিতিতে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো, অন্যায়কে প্রত্যাখ্যান করা এবং আদর্শের প্রশ্নে আপসহীন থাকা ইমানের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
জীবনের কঠিন বাস্তবতায় ধৈর্য ও সহনশীলতার শিক্ষা দেয় মহররম। মানবজীবন স্বভাবতই পরীক্ষামূলক। প্রতিকূল পরিস্থিতি একজন মানুষের ইমান, চরিত্র ও মানসিক দৃঢ়তার প্রকৃত পরীক্ষা নিয়ে আসে। কারবালার করুণ ও ঐতিহাসিক ঘটনা এবং আশুরার স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন অধ্যায় আমাদের সামনে ধৈর্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরে।
মহররম আমাদের অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে সচেতন ও দায়িত্বশীল অবস্থান গ্রহণের শিক্ষা দেয়। জুলুম, অবিচার বা অন্যায়কে সমর্থন না করে সর্বাবস্থায় ন্যায় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। মহররমের ইতিহাস, বিশেষ করে কারবালার ঘটনা আমাদের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে যে অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। তবে ইসলামের শিক্ষা হলো, এই প্রতিবাদ হতে হবে জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং শরিয়তের নির্দেশনার আলোকে, যাতে তা বিশৃঙ্খলা বা ফিতনার কারণ না হয়।
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।