মানবসভ্যতার ইতিহাসে চিকিৎসাসেবা এক মহৎ ও সম্মানজনক পেশা। অসুস্থ মানুষের সেবা করা, আহতের পরিচর্যা এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি একটি প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল।’ (সুরা মায়িদা: ৩২)
আজকের দিনে চিকিৎসাসেবায় নারীর অংশগ্রহণকে আধুনিক যুগের অগ্রগতি মনে করা হলেও, ইসলামের সূচনালগ্নেই এর গৌরবময় ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারী সাহাবিরা চিকিৎসা ও মানবসেবায় অনন্য অবদান রেখে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে আহতদের সেবা, অসুস্থদের পরিচর্যা, খাদ্য ও পানি সরবরাহের মতো কঠিন কাজে তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। এমন কয়েকজন মহীয়সী নারী সাহাবির চিকিৎসাসেবার সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
তিনি চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী নারী সাহাবিদের অগ্রভাগে রয়েছেন। তাঁকে ইসলামের ইতিহাসের ‘প্রথম মুসলিম নারী চিকিৎসক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। চিকিৎসা-দক্ষতা, মানবিকতা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতার এক অপূর্ব সমন্বয় ছিল তাঁর মধ্যে। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সাহাবিদের জরুরি চিকিৎসার জন্য তিনি নিজস্ব উদ্যোগে একটি অস্থায়ী চিকিৎসা শিবির বা মোবাইল তাঁবু পরিচালনা করতেন।
খন্দকের যুদ্ধে বিখ্যাত সাহাবি সাদ ইবনে মুআজ (রা.)-এর বাহুর শিরায় গভীর আঘাত লাগলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তাকে রুফাইদার তাঁবুতে নিয়ে যাও; যাতে আমি কাছ থেকে তার খোঁজখবর নিতে পারি।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় সেখানে গিয়ে সাদ (রা.)-এর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতেন। (আল-আদাবুল মুফরাদ: ১১২৯; আল-ইসাবাহ: ৮ / ১৩৬)
এই ঘটনা রুফাইদা (রা.)-এর চিকিৎসা দক্ষতার প্রতি স্বয়ং নবীজির রাষ্ট্রীয় ও নববি স্বীকৃতির এক উজ্জ্বল প্রমাণ।
উম্মে আতিইয়া (রা.) ছিলেন তৎকালীন চিকিৎসাসেবায় আরেক অনন্য নাম। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত থেকে তিনি সেবা দিয়েছেন। তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। আমি সৈন্যদের ব্যারাকে পেছনে অবস্থান করতাম, তাদের জন্য খাবার প্রস্তুত করতাম, আহতদের চিকিৎসা করতাম এবং অসুস্থদের সেবা-শুশ্রূষা করতাম।’ (সহিহ্ মুসলিম: ১৮১২)
উম্মে সুলাইম (রা.)-এর জীবনেও চিকিৎসাসেবা ও বীরত্বের অনন্য এক চিত্র ফুটে ওঠে। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে পানি সরবরাহ করতেন, আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিতেন এবং জরুরি মুহূর্তে অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে সেবায় আত্মনিয়োগ করতেন। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মে সুলাইম এবং আনসারদের কয়েকজন নারীকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধে যেতেন; তাঁরা মুজাহিদদের পানি পান করাতেন এবং আহতদের চিকিৎসা করতেন। (সহিহ্ মুসলিম: ১৮১০)
রুবাইয়ি (রা.) যুদ্ধের ময়দানে প্রাথমিক চিকিৎসার পাশাপাশি লজিস্টিক সাপোর্টেও যুক্ত ছিলেন। তিনি বর্ণনা করেন—‘আমরা নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নিয়ে লোকেদের পানি পান করাতাম, আহতদের পরিচর্যা করতাম এবং শহীদদের লাশ মদিনায় ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতাম।’ (সহিহ্ বুখারি: ২৮৮২)
নুসাইবা বিনতে কাআব (রা.) ওহুদের যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সশরীরে ঢাল হয়ে রক্ষা করার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার মহান দায়িত্বও পালন করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সাহাবিদের পানি পৌঁছে দেওয়া, সেবাযত্ন করা এবং প্রয়োজনে দ্রুত ব্যান্ডেজ ও চিকিৎসাসহায়তা দেওয়ার কাজে তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। (আল-ইসাবাহ: ৮/৩৩৪)
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা বিনতে আবু বকর (রা.) ছিলেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। ফিকহ, হাদিস ও শরিয়তের গভীর প্রজ্ঞার পাশাপাশি চিকিৎসাবিদ্যাতেও তিনি বিশেষ পারদর্শিতা ও তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। বিখ্যাত তাবেয়ি উরওয়া ইবনে জুবাইর (রহ.) বলেন, ‘চিকিৎসাবিদ্যা, ফিকহ এবং কবিতায় আমি উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)-এর চেয়ে অধিক জ্ঞানী কাউকে দেখিনি।’ (আল-ইসাবাহ: ৮ / ২৩৩)
হামনা বিনতে জাহশ (রা.) ওহুদের ঐতিহাসিক ও কঠিন যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন। যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তৃষ্ণার্ত মুজাহিদদের পানি পান করাতেন এবং আহতদের ক্ষতে ওষুধ ও পট্টি লাগিয়ে সেবা করতেন। (আত-তবাকাতুল কুবরা লি ইবনে সাদ: ৮ / ১৯১)
লেখক: গবেষক ও শরিয়াহ কনসালট্যান্ট