বর্তমানে প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতার খবর যখন ডাল-ভাতের মতো শোনা যায়, তখন ইসলাম আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক অনন্য নৈতিকতার পাঠ। ইসলাম একদিকে যেমন প্রয়োজনে প্রাণী থেকে বৈধ উপকারের অনুমতি দিয়েছে, অন্যদিকে তাদের অধিকার ও কষ্টের বিষয়েও করেছে সচেতন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সৃষ্টিকুলের জন্য রহমতস্বরূপ। তিনি যদি দেখতেন, কেউ কোনো প্রাণীকে কষ্ট দিচ্ছে, তিনি কঠোরভাবে সতর্ক করতেন। হজরত আবদুল্লাহ বিন জাফর (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) এক আনসারি সাহাবির বাগানে প্রবেশ করলেন। সেখানে একটি উট নবীজিকে (সা.) দেখে করুণভাবে কাঁদতে শুরু করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্নেহের পরশে উটটির ঘাড় ও পিঠে হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করেন। এরপর তিনি উটের মালিককে ডেকে বললেন, ‘আল্লাহ তোমাকে এই নির্বাক প্রাণীর মালিক বানিয়েছেন; এর ব্যাপারে তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো না? এই উটটি আমার কাছে অভিযোগ করেছে যে তুমি তাকে ক্ষুধার্ত রাখো এবং সাধ্যের অতিরিক্ত পরিশ্রম করাও।’ (সুনানে আবু দাউদ: ২৫৪৯)
সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা কতটা গভীরভাবে ধারণ করেছিলেন, তা হজরত আনাস (রা.)-এর একটি বর্ণনায় স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘আমরা কোথাও সফরে গেলে ততক্ষণ পর্যন্ত নফল বা সুন্নত নামাজে দাঁড়াতাম না, যতক্ষণ না আমাদের ভারবাহী উটের পিঠ থেকে বোঝা নামিয়ে তাকে আরাম দিতাম।’ (আবু দাউদ: ২৫৫১)। অর্থাৎ আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হওয়ার আগে সৃষ্টির আরাম নিশ্চিত করাকেও তাঁরা দ্বীনি দায়িত্ব মনে করতেন।
প্রাণীর সেবা যে জান্নাতের পথ প্রশস্ত করতে পারে, তার অন্যতম উদাহরণ হলো সেই তৃষ্ণার্ত কুকুরের ঘটনা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এক নারী প্রচণ্ড তৃষ্ণায় কাতর কুকুরকে কুয়া থেকে পানি তুলে পান করানোর কারণে আল্লাহর অশেষ রহমত ও ক্ষমা লাভ করেছিল। সাহাবিরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, পশুপাখির সেবাতেও কি সওয়াব আছে?’ তিনি উত্তরে বললেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীর সেবার মধ্যেই সওয়াব নিহিত।’ (সহিহ বুখারি: ২৩৬৩)
ইসলামি ফিকহের প্রখ্যাত গ্রন্থ ‘আদ-দুররুল মুখতার’-এ উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো প্রাণীকে দিয়ে কাজ করানোর ক্ষেত্রে তাকে প্রহার করা বা অতিরিক্ত কষ্ট দেওয়া হারাম। এমনকি বলা হয়েছে, প্রাণীর ওপর জুলুম করা গুরুতর অপরাধ। কারণ নির্বাক প্রাণী মানুষের কাছে তার কষ্টের কথা বলতে পারে না। (রদ্দুল মুহতার: ৯ / ৪৯১)
প্রাণীকে কষ্ট দেওয়ার প্রতিটি রূপ ইসলামে নিষিদ্ধ। ক্ষুধার্ত রাখা, কষ্ট দেওয়া, জীবন্ত অবস্থায় অঙ্গহানি করা, অযথা হত্যা করা, নিশানা বানিয়ে পাথর বা তির ছোড়া কিংবা প্রাণীদের মধ্যে লড়াই লাগানো—সবই কবিরা গুনাহ। হাদিসে প্রাণীকে কষ্ট দিয়ে মেরে ফেলার জন্য এক নারীকে জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করানো হয়েছে মর্মে বর্ণিত হয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘এক নারীকে একটি বিড়ালের কারণে আজাব দেওয়া হয়েছিল। সে বিড়ালটিকে বেঁধে রেখেছিল। সে অবস্থায় বিড়ালটি মরে যায়। মহিলাটি ওই কারণে জাহান্নামে গেল। কেননা সে বিড়ালটিকে খানাপিনা কিছুই করায়নি এবং ছেড়েও দেয়নি, যাতে সে জমিনের পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে।’ (সহিহ মুসলিম: ২২৪২)
প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা যেমন আল্লাহর ক্রোধকে অনিবার্য করে তোলে, তেমনি তাদের প্রতি সামান্য মমতাও হতে পারে আমাদের পরকালীন মুক্তির অসিলা।
লেখক: শিক্ষার্থী, উচ্চতর ইসলামি আইন বিভাগ, জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা, ঢাকা।