১৪৪৭ হিজরির হজের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবী থেকে সৌভাগ্যবান হাজি সাহেবগণ আল্লাহর ঘরে পৌঁছাতে শুরু করেছেন। সেখানে পৌঁছানোর পর হজের মূল কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগের দিনগুলো আত্মশুদ্ধি, হজের প্রস্তুতি ও আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের সুবর্ণ একটি সুযোগ। একজন সচেতন হজযাত্রী এ সময়টি পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগালে তাঁর হজ আরও অর্থবহ ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। নিচে এ সময়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় তুলে ধরা হলো—
হারামাইন শরিফাইনে অধিক সময় ব্যয়
মক্কায় অবস্থানকালে মসজিদে হারামে এবং মদিনায় মসজিদে নববিতেই বেশি সময় কাটানো উচিত। এসব স্থানে প্রতি রাকাত নামাজের সওয়াব যেমন বহুগুণ বেশি পাওয়া যায়, অন্যান্য ইবাদতও এর ব্যতিক্রম নয়। হোটেলে অলস সময় না কাটিয়ে তাই যতটা সম্ভব মসজিদে অবস্থান করতে পারা একজন হজযাত্রীর জন্য অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয়।
এই সময়টাতে নামাজের পাশাপাশি কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া ও মক্কায় থাকলে বেশি বেশি বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করা উচিত। হারাম শরিফে বসে আল্লাহর স্মরণ হৃদয়ে যে প্রশান্তি এনে দেয়, তা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। এই পবিত্র পরিবেশ মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে রেখে ইবাদতের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। এই সময়টাকে যত বেশি সম্ভব হারামাইন শরিফাইনে কাটানোর চেষ্টা করতে হবে, যেন প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদতে পরিণত হয়।
নফল ইবাদতে মনোযোগ বৃদ্ধি
হজের আগের এই দিনগুলো নফল ইবাদতের সুবর্ণ সুযোগ। নিজের ফ্যামিলি ও দেশ থেকে দূরে থাকায় ইহকালীন চিন্তা ফিকিরও তখন থাকে না। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমলনামা সমৃদ্ধ করা যায়। গুরুত্ব দিয়ে তাহাজ্জুদ নামাজের অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। গভীর রাতে আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে নামাজ ও দোয়া করতে পারা বান্দার জন্য অত্যন্ত সম্মানের বিষয়।
কোরআন তিলাওয়াত ও তাদাব্বুর
কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে যে পবিত্র ভূমিতে, সেখানে বসে কোরআন তিলাওয়াত করতে পারা অপরিসীম সৌভাগ্যের। এই সময়টাতে শুধু তিলাওয়াত করাই যথেষ্ট নয়, এর অর্থ বোঝার চেষ্টা এবং তাদাব্বুর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদাব্বুর বা গভীর চিন্তার মাধ্যমে কোরআনের বার্তা হৃদয়ে ধারণ করা যায়।
একজন হজযাত্রী যদি প্রতিদিন কিছু সময় নির্ধারণ করে কোরআন তিলাওয়াত ও তার অর্থ নিয়ে ভাবেন, তবে তা তাঁর আত্মিক উন্নতিতে বড় ভূমিকা রাখবে। কোরআনের আয়াতগুলো জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা, নিজের ভুলগুলো চিহ্নিত করা এবং সংশোধনের চেষ্টা করা এই সময়ের অন্যতম করণীয়।
হজের মাসায়েল ও নিয়মকানুন চর্চা
হজ একটি বিধিবদ্ধ ইবাদত, যার প্রতিটি ধাপ নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী সম্পন্ন করতে হয়। তাই সৌদি পৌঁছানোর পর হজের মূল কার্যক্রম শুরু হওয়ার পূর্ববর্তী এই সময়টাতে হজের মাসায়েল ভালোভাবে শিখে নেওয়া জরুরি। ইহরাম, তাওয়াফ, সায়ি, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান, মুজদালিফায় রাত যাপন, মিনার কার্যক্রম—এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা থাকা আবশ্যক।
অনেক সময় দেখা যায়, অজ্ঞতার কারণে মানুষ ভুল করে বসে, যা হজের সওয়াব কমিয়ে দেওয়াসহ কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাফফারাও ওয়াজিব করে দিতে পারে। তাই অভিজ্ঞ আলেমদের কাছ থেকে বা নির্ভরযোগ্য বই ও গাইডলাইন থেকে হজের নিয়মগুলো জেনে নেওয়া জরুরি।
নিয়মিত দোয়ার আমল
হজের সময় দোয়া কবুলের বিশেষ সুযোগ থাকে। তাই সেখানে অবস্থানের দিনগুলোতে বেশি বেশি দোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজের জন্য, পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং পুরো উম্মাহর জন্য দোয়া করা উচিত। হজের এই সফরকে কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সামষ্টিক কল্যাণের জন্য দোয়া করা একজন মুমিনের দায়িত্ব। দোয়া মানুষের অন্তরকে নরম করে, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে এবং আত্মিক প্রশান্তি এনে দেয়। তাই এই সময়টাকে দোয়ার মাধ্যমে সমৃদ্ধ করা যেতে পারে।
সহযাত্রীদের সঙ্গে সদাচরণ
হজ একটি সামষ্টিক ইবাদত, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষজন একত্র হন। এরা সবাই আল্লাহ তাআলার মেহমান। এই সময়টাতে তাই সহযাত্রীদের সঙ্গে ভালো আচরণ করা আবশ্যক। কেউ অসুস্থ হলে তাঁকে সাহায্য করা, বিপদে পড়লে উত্তরণের পথ দেখানো, প্রয়োজন হলে নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে অন্যকে সহযোগিতা করা—এসব কাজ আল্লাহ তাআলার অত্যন্ত প্রিয়। ভালো আচরণ সহজেই মানুষের মন জয় করে। একজন হজযাত্রীর জন্য সর্বদা হাসিমুখে, বিনয়ের সঙ্গে এবং সহানুভূতির মনোভাব নিয়ে চলাফেরা করা উচিত।
ডিজিটাল ডিভাইস থেকে দূরে থাকা
হজের এই সফর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক সফর। হজ এমন একটি ইবাদত, যেখানে বান্দা দুনিয়ার সব পরিচয়-প্রদর্শন ছেড়ে আল্লাহর সামনে একান্তভাবে আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজকাল অনেক হাজি এই পবিত্র সফরকেও আত্ম-প্রদর্শনের মাধ্যম বানিয়ে ফেলেন। সেলফি তোলা, ভিডিও ধারণ করা এবং সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা যেন একধরনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। এতে ইখলাস নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা ইবাদতের প্রাণ। তা ছাড়া এসব কার্যকলাপ অন্য হাজিদের ইবাদতে বিঘ্ন সৃষ্টি করে এবং পবিত্র পরিবেশের মর্যাদাও ক্ষুণ্ন করে। তাই একজন সচেতন হাজির উচিত, এসব প্রদর্শনীমূলক আচরণ পরিহার করে নীরবে, বিনম্রভাবে এবং আন্তরিকতার সঙ্গে হজের প্রতিটি আমল আদায় করা।