হোম > ইসলাম

শিশুদের খেলার সঙ্গী হতেন নবীজি (সা.)

আমিনুল ইসলাম হুসাইনী 

ছবি: সংগৃহীত

শিশুরা আনন্দপ্রিয়। একটু হইহুল্লোড়, লাফালাফি করে বলেই ওরা শিশু। তাদের কাঁচা মুখের পাকা কথা আমাদের আনন্দ দেয়। আমরা তখন তাদের আদর-সোহাগ করি। বুড়ো-বুড়ি বলে খুনসুটি করি। তারা যদি বড়দের মতো গম্ভীর হয়ে বসে থাকত, তখন কি আমাদের ভালো লাগত! মোটেই না। তারা হইহুল্লোড় করে বলেই আমরা তাদের কাঁধে তুলে নিই। শিশুদের কাঁধে তুলে নেওয়া কিন্তু নবীজি (সা.)-এর সুন্নত। হজরত বারা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হাসানকে নবী (সা.)-এর কাঁধের ওপর দেখেছি। সে সময় রাসুল (সা.) বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আমি একে ভালোবাসি, তুমিও তাকে ভালোবাসো।’ (সহিহ বুখারি: ৩৭৪৯)

শিশুর আনন্দমুখর শৈশব

শিশুর মেধা বিকাশ ও ব্যক্তিত্ব গঠনে খেলাধুলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মনে রাখবেন, চঞ্চল শিশুরা কৌতূহলী হয়। নতুন কিছু শেখার প্রতি তাদের আগ্রহ বেশি থাকে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো শিশুকে ভবিষ্যতে একজন সৃজনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। অপর দিকে নিঃসঙ্গ ও নিরানন্দ জীবন শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা দেয়। এ জন্য তাদের লাফালাফি, হুলুস্থুল কাণ্ডে কখনোই বিরক্ত হবেন না। বরং তাদের খেলাধুলার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিন। একটি আনন্দময় শৈশব উপহার দিন। ইসলাম তো এ কথাই বলে। রাসুল (সা.) প্রায়ই শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলা করতেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সা.) দিনের এক অংশে বের হলেন, তিনি আমার সঙ্গে কথা বলেননি এবং আমিও তাঁর সঙ্গে কথা বলিনি। অবশেষে তিনি বনু কাইনুকা বাজারে গেলেন, সেখান থেকে ফিরে এসে হজরত ফাতেমা (রা.)-এর ঘরের আঙিনায় বসলেন। অতঃপর বললেন, এখানে খোকা (হাসান) আছে কি? এখানে খোকা আছে কি? ফাতেমা (রা.) তাঁকে কিছুক্ষণ সময় দিলেন। আমার ধারণা হলো, তিনি তাঁকে পুঁতির মালা পরাচ্ছিলেন। তারপর তিনি দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং চুমু খেলেন। এরপর তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহ, তুমি তাকে (হাসানকে) মহব্বত করো এবং তাকে যে ভালোবাসবে তাকেও মহব্বত করো।’ (সহিহ বুখারি: ২১২২)

অনেক মা-বাবা সন্তানকে সারাক্ষণ পড়ার টেবিলে বসিয়ে রাখেন। এতে পড়ার প্রতি শিশুর একঘেয়েমি তৈরি হয়। শিশুর মস্তিষ্কের ওপর চাপ পড়ে। তখন পড়াশোনা তো হয়ই না, উল্টো মানসিক সমস্যা সৃষ্টি হয়। তাই শিশুদের দীর্ঘক্ষণ পড়ার টেবিলে না বসিয়ে খেলাধুলারও সুযোগ করে দেওয়া উচিত। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে একটু খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্থা রাখুন। নিজেও সন্তানের খেলার সঙ্গী হোন। প্রিয় নবী (সা.) শিশুদের খেলার সঙ্গী হতেন। হজরত হুসাইন একদিন পথের ধারে খেলছিলেন। প্রিয় নবী (সা.) সেই পথ ধরেই যাচ্ছিলেন কোথাও। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কয়েকজন সাহাবি। নবীজি (সা.) আদরের নাতি হুসাইনকে দেখেই সঙ্গে থাকা সবাইকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেলেন। বরকতময় দুই হাত প্রসারিত করে দিলেন। প্রিয় নানাকে দেখে হুসাইন ছুটোছুটি করতে লাগল। নবী (সা.) তাকে হাসতে হাসতে ধরে ফেললেন, আদর মেখে দিলেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৪৪)

শিশুদের উপযোগী খেলা

শিশুর প্রয়োজন শিশুতোষ খেলাধুলা। একটু দৌড়ঝাঁপ, অল্পক্ষণ ছুটোছুটি আছে—এমন খেলাই তাদের শরীরের জন্য উপকারী। যেমন হাঁটা, দৌড়, সাঁতার, ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, ভলিবল ইত্যাদি খেলা। এসব খেলাধুলা শরীরে রক্ত সঞ্চালন ঘটায়, পরিপাকতন্ত্রকে সবল করে এবং খাদ্য হজমে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এসব খেলাধুলায় একটু পরিশ্রম হয়। ঘাবড়ানোর কিছু নেই। শিশু যখন খেলাধুলা করে ঘামে, সেই ঘামের সঙ্গে শরীরের দূষিত পদার্থ বেরিয়ে যায়। খেলাধুলায় আপনার সন্তান হয়তো সাময়িক ক্লান্ত হবে। কিন্তু এর বিনিময়ে দৈহিক শক্তি সঞ্চয় হবে। খাবারের চাহিদা বাড়বে। শরীর ও মন উভয়ই সুস্থ ও চনমনে থাকবে।

মোবাইল ফোনে গেমস খেলা ইত্যাদি থেকে শিশুদের দূরে রাখুন। এসবে কোনো উপকার নেই। সবটুকুই ক্ষতি। এসব খেলা শিশুদের অলস, দুর্বল ও মানসিকভাবে অসুস্থ করে তুলে। এটি আপনার শিশুর শারীরিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণও হতে পারে।

শিশুদের খেলনার বিষয়ে সতর্কতা

শিশুদের খেলনা কেমন হবে তা নির্ভর করে তাদের বয়স, আগ্রহ ও বিকাশের ধাপের ওপর; খেলনা হওয়া উচিত নিরাপদ, অবিষাক্ত, ধারহীন, মসৃণ, শিক্ষামূলক, সৃজনশীল এবং শারীরিক বিকাশে সহায়ক। ছেলেশিশুদের জন্য নিষেধ নয়, এমন খেলা মেয়েশিশুরাও খেলতে পারবে। কোনো বাধানিষেধ নেই। তবে মেয়েশিশুদের কিছু প্রচলিত খেলা রয়েছে। যেমন, রান্নাবান্না, পুতুল খেলা। রান্নাবান্না খেলায় কোনো আপত্তি না থাকলেও পুতুল খেলায় কিছু নির্দেশনা রয়েছে। যেসব পুতুল অবিকল প্রাণীর মতো, সেসব পুতুল দিয়ে খেলা জায়েজ নেই। তবে চোখ-মুখ না থাকলে অর্থাৎ প্রাণীর চেহারা বোঝা যায় না, এমন পুতুল দিয়ে খেলার সুযোগ আছে। যেমন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) কাপড়ের পুতুল দিয়ে খেলেছিলেন। এসবের চোখ-কান তথা মুখের অবয়ব ছিল না।

হাদিসে এসেছে—আয়েশা (রা.) যখন ছোট ছিলেন, তখন কাপড়ের তৈরি পুতুল নিয়ে খেলা করতেন। তার মধ্যে একটি ঘোড়া ছিল, যার দুটি ডানা ছিল। নবীজি তা দেখে বললেন, ‘এটা কী?’ আয়েশা (রা.) বললেন, ‘ঘোড়া’। তিনি বললেন, ‘ঘোড়ার আবার দুটি ডানা?’ আয়েশা (রা.) বললেন, ‘আপনি কি শোনেননি, সোলায়মান নবীর ডানাওয়ালা ঘোড়া ছিল?’ এ কথা শুনে নবীজি (সা.) হাসলেন এবং সে হাসিতে তাঁর চোয়ালের দাঁত দেখা গিয়েছিল।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৩৪)

শৈশবের আনন্দ ও খেলাধুলা শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের মনে রাখা উচিত, আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যৎ। আসুন নবীজি (সা.)-এর সুন্নত অনুসরণ করে তাদের প্রতি স্নেহশীল হই, তাদের খেলার সঙ্গী হই এবং মুক্ত বাতাসে দৌড়ঝাঁপ করার সুযোগ করে দিই। একটি প্রাণবন্ত ও আনন্দময় শৈশবই পারে একটি শিশুকে শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে।

লেখক: প্রাবন্ধিক; খতিব, কসবা জামে মসজিদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

পণ্য মজুতদারি ও সিন্ডিকেট: ইসলামের সতর্কবার্তা

আজকের নামাজের সময়সূচি: ১০ জানুয়ারি ২০২৬

জুমার দিন সুরা কাহাফ পাঠ করলে যে সওয়াব

দোয়া কবুলের অন্যতম মাধ্যম দরুদ পাঠ

আয়-উপার্জনে বরকত ও ঋণমুক্তির আমল

মৃত্যু ও পরকাল: অবিনশ্বর জীবনের অনিবার্য যাত্রা

প্রাণীর প্রতি সহানুভূতির সওয়াব ও নির্মমতার শাস্তি

আজকের নামাজের সময়সূচি: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬

পবিত্র কোরআনে কলমের বন্দনা

নবীজির জীবন থেকে কৃতজ্ঞ বান্দা হওয়ার শিক্ষা