পৃথিবীর ইতিহাসে কোটি কোটি মানুষের মধ্যে একমাত্র হাকিম ইবনে হিজাম (রা.)-ই সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি, যিনি পবিত্র কাবাঘরের ভেতরে ভূমিষ্ঠ হওয়ার অনন্য মর্যাদা লাভ করেছেন। হস্তী বাহিনীর ঘটনার ১৩ বছর আগে এই বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে।
হাকিম (রা.)-এর মা ফাখিতা বিনতে জুহাইর একবার কুরাইশ নারীদের একটি দলের সঙ্গে কাবাঘরের ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন। হঠাৎ সেখানে তাঁর প্রসববেদনা শুরু হয়। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, তাৎক্ষণিক বের হওয়া সম্ভব ছিল না। নিরুপায় হয়ে কাবার ভেতরেই একটি চামড়া বিছিয়ে দেওয়া হয় এবং সেখানেই জন্ম নেন হাকিম ইবনে হিজাম।
নবীজি (সা.)-এর জন্মের ১৩ বছর আগে এ ঘটনা ঘটে। সম্পর্কে তিনি ছিলেন উম্মুল মুমিনিন হজরত খাদিজা (রা.)-এর আপন ভাতিজা।
হাকিম (রা.) মক্কার এক সম্পদশালী ও অভিজাত পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তিনি এতটাই বুদ্ধিমান ও ভদ্র ছিলেন যে, আরবের প্রথা ভেঙে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই তাঁকে কুরাইশদের ‘পরামর্শ সভা’র সদস্য করা হয়েছিল (যেখানে সাধারণ নিয়ম ছিল ৪০ বছর)। ইসলাম গ্রহণের আগেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরোপকারী। মক্কায় আগত হাজিদের আপ্যায়ন ও অভাবীদের সাহায্য করার কারণে তাঁকে ‘মুতয়িম’ বা অন্নদাতা বলা হতো।
নবীজি (সা.) ও বনু হাশিম যখন ‘শিবে আবি তালিবে’ অবরুদ্ধ ছিলেন, তখন হাকিম (রা.) অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও গোপনে তাঁর ফুফু খাদিজা (রা.)-এর জন্য উটের পিঠে করে খাদ্যসামগ্রী পাঠাতেন।
নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব থাকা সত্ত্বেও হাকিম (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন অনেক দেরিতে—অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের দিন। তখন তাঁর বয়স ছিল ৭৪ বছর। কেন সত্য ধর্ম গ্রহণ করতে এত দেরি হলো, তা নিয়ে তিনি সারা জীবন আফসোস করতেন। মক্কা বিজয়ের দিন নবীজি (সা.) তাঁকে বিশেষ সম্মান দিয়ে ঘোষণা করেছিলেন, ‘যে ব্যক্তি হাকিম ইবনে হিজামের ঘরে আশ্রয় নেবে, সে নিরাপদ।’
একবার নবীজি (সা.) তাঁকে একটি ছাগল কেনার জন্য এক দিনার দিয়েছিলেন। তিনি সেই এক দিনারে একটি ছাগল কিনে তা দুই দিনারে বিক্রি করেন এবং পুনরায় এক দিনার দিয়ে আরেকটি ছাগল কিনে নবীজিকে ছাগল ও এক দিনার লভ্যাংশ বুঝিয়ে দেন। নবীজি (সা.) তাঁর এই ব্যবসায়িক বুদ্ধিতে খুশি হয়ে তাঁর বরকতের জন্য দোয়া করেন।
মক্কার কুরাইশ নেতাদের ঐতিহাসিক পরামর্শ কেন্দ্র ‘দারুন নাদওয়া’র মালিক ছিলেন হাকিম (রা.)। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি এটি হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর কাছে এক লাখ দিরহামে বিক্রি করে দেন। কুরাইশরা যখন তাঁকে বংশীয় মর্যাদার প্রতীক বিক্রির জন্য তিরস্কার করেন, তখন তিনি এক ঐতিহাসিক জবাব দেন। তিনি বলেন—
‘জাহেলি যুগের সব মর্যাদার বিলুপ্তি ঘটেছে। এখন একমাত্র মর্যাদা হলো তাকওয়া। এই বাড়ি আমি জাহেলি যুগে এক মটকা মদের বিনিময়ে কিনেছিলাম আর এখন তা বিক্রি করলাম এক লাখ দিরহামে। সাক্ষী থাকুন, এর সব অর্থ আমি আল্লাহর রাস্তায় সদকা করে দিলাম।’
ইসলাম গ্রহণের পর হাকিম (রা.) তাঁর বাকি জীবন ইবাদত ও দানে উৎসর্গ করেন। তিনি একাধিকবার হজ করেছেন। কোনো এক হজে তিনি ১০০টি উট ও এক হাজার ছাগল কোরবানি করেন এবং ১০০ জন দাসকে মুক্ত করে দেন। তিনি সব সময় বলতেন, ‘যে আল্লাহ আমাকে বদরের যুদ্ধে কাফের অবস্থায় মৃত্যু থেকে বাঁচিয়েছেন, তাঁর শুকরিয়া আদায় শেষ হওয়ার নয়।’
হাকিম ইবনে হিজাম (রা.) ১২০ বছর বয়সে ৫৪ হিজরিতে মদিনায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর জীবনের ১২০ বছরের মধ্যে প্রায় অর্ধেক জীবন কেটেছে জাহেলিয়াতের যুগে এবং বাকি জীবন ছিল ইসলামের আলোকোজ্জ্বল পথে। কাবার ভেতরে জন্মের সেই বিরল স্মৃতি তাঁকে ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।
তথ্যসূত্র: সিয়ারু আলামিন নুবালা, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ও উসদুল গাবাহ।