যুক্তরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক গোলাবারুদের ঘাটতি দেখা দিয়েছে—এমন প্রতিবেদন অস্বীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, দেশটির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন, যারা এ ধরনের তথ্য ফাঁস করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তুরস্কের রাষ্ট্র পরিচালিত বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
ট্রাম্প নিজ মালিকানাধীন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ রয়েছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু ধরনের গোলাবারুদের ক্ষেত্রে। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ তৈরি করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হচ্ছে। প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কারখানা ও উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণ করছে।’
সংবাদমাধ্যমের কাছে ঘাঁটতির বিষয়ে তথ্য ফাঁসকারীদের হুমকি দিয়ে তিনি আরও লিখেছেন, ‘এই রাষ্ট্রদ্রোহী বক্তব্য ফাঁসকারীদের খুঁজে বের করা হচ্ছে। তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের আবেদন করা হবে!’
যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সংবাদমাধ্যমে এমন প্রতিবেদন প্রকাশের পর ট্রাম্প এই বক্তব্য দিলেন। ওই প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছিল, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টরের মজুত কমে যাওয়া ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা চালানো থেকে প্রশাসনের বিরত থাকার অন্যতম কারণ ছিল।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত সপ্তাহে মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেভিডে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকের সময় ট্রাম্প প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের বিকল্প সীমিত করে দেওয়া গুরুতর গোলাবারুদ সংকট নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করেন। তবে হোয়াইট হাউস এবং পেন্টাগন উভয়েই ওই প্রতিবেদন অস্বীকার করেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ইরানের সঙ্গে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের অতি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং প্যাট্রিয়ট মিজাইলের প্রায় অর্ধেক খরচ করে ফেলেছে।
সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি সূত্র ও সম্প্রতি সম্পন্ন করা অস্ত্রের হিসাবের বরাত দিয়ে সিএনএন জানায়, পেন্টাগনের সার্বিক অস্ত্র ও গোলাবারুদের পরিমাণকে মার্কিন শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা গোপনে ‘বিপজ্জনক মাত্রায় কম’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এর পাশাপাশি আগে অপ্রকাশিত টার্মিনাল হাই অল্টিট্যুড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) মিজাইলের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ নিয়েও উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ বাঁধার আগে আমেরিকার অস্ত্রাগারে সর্বাধুনিক সংস্করণের প্রায় ২ হাজার ২০০টি প্যাট্রিয়ট এবং ৪৫২টি থাড মিজাইল সংরক্ষিত ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল উপসাগরীয় দেশগুলো সতর্ক বার্তা দিয়ে বলেছে, এই অভাবের ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকানোর দক্ষতা ভেঙে পড়তে পারে। বিশেষত আমেরিকা যদি ভবিষ্যতে ইরানে পুনরায় হামলা চালায়, তবে তার পাল্টা জবাবে এই অঞ্চলগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো আক্রমণের মুখে পড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সাথে পাঁচ মাসব্যাপী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী তাদের বিশ্বব্যাপী মজুত থাকা অত্যন্ত নির্ভুল দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের একটা বড় অংশই শেষ করে ফেলেছে। বিষয়টির সাথে জড়িত তিনজন ব্যক্তি এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ফলে পরবর্তীতে অন্য কোনো সংঘাত দেখা দিলে মার্কিন বাহিনী তা কতটা সামাল দিতে পারবে, তা নিয়ে জোর সংশয় দেখা দিয়েছে।
প্রধানত মার্কিন সেনাবাহিনীর স্থল থেকে স্থলে নিক্ষেপযোগ্য দুই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ তলানিতে ঠেকেছে—যার একটি হলো ‘আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম’ (এটিএসিএমএস) এবং অন্যটি ‘প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল’ (পিআরএসএম)। এ বিষয়ে অবহিত দুই ব্যক্তি জানান, আমেরিকা এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর ‘প্রায় পুরোটাই’ শেষ করে এনেছে।
আমেরিকার এটিএসিএমএস ও পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ কতটা কমেছে, তা এর পূর্বে কখনো প্রকাশ্যে আসেনি। একেকটি ক্ষেপণাস্ত্রের মূল্য ১০ লাখ ডলারেরও বেশি, যা মার্কিন সমরাস্ত্রাগারের মূল স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। কেননা এসব অস্ত্র ব্যবহার করে বেশ নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেও অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে শত্রুর ঘাটিতে আঘাত হানা সম্ভব।