ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণ
প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে অর্থনৈতিক শক্তিকে অস্ত্রে পরিণত করার একধরনের একচেটিয়া আধিপত্য বহুদিন উপভোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যেসব রাষ্ট্রকে বাগে আনতে ব্যর্থ হতো, তাদের ডলার বা সিলিকন ভ্যালির সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে তারা শাস্তি দিত। তবে এক বছরের মধ্যে দুবার বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ কমছে যুক্তরাষ্ট্রের। ইরান ও চীনের সামনে যুক্তরাষ্ট্র নতজানু হতে বাধ্য হয়েছে বলে এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে।
হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনের কয়েক সপ্তাহ পরই বিশ্বব্যাপী ব্যাপক শুল্ক আরোপ শুরু করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একপর্যায়ে চীনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লে বিরল খনিজের রপ্তানি স্থগিত করে দেয় বেইজিং। প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিরল খনিজের সরবরাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং চীন এই খাত প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। আবার ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় তেহরান। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে বিশ্বব্যাপী দেখা দেয় জ্বালানি সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধি।
প্রথমত, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধে একটি যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে চীন দুর্লভ খনিজ পদার্থের ওপর তার আধিপত্য কাজে লাগিয়েছিল। এরপর ইরান কার্যকরভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে জিম্মি করে ফেলে এবং এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের প্রায় ছয় সপ্তাহের যুদ্ধে একটি যুদ্ধবিরতি ঘটে।
অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার সুযোগ নেওয়া কোনো নতুন ঘটনা নয়। ১৯৭৩ সালের আরব তেল নিষেধাজ্ঞা তার একটি ভালো উদাহরণ। তবে আজকের বৈশ্বিক অর্থনীতি কৌশলগত উদ্দেশ্যে বাণিজ্যিক সংযোগ কাজে লাগানোর আরও বেশি সুযোগ করে দিচ্ছে। সামগ্রিক উৎপাদনের অংশ হিসেবে বাণিজ্যের পরিমাণ ১৯৭৩ সালের তুলনায় আজ দ্বিগুণ। তবে ট্রাম্প প্রায়শই এমনভাবে কথা বলেন, যেন তাঁর দেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে অবস্থান করছে। চলতি বছরের শুরুতে তিনি বলেছিলেন, কানাডা থেকে কোনো কিছু আমদানির প্রয়োজন মার্কিনদের নেই, অথচ মার্কিন আমদানির দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস কানাডা। এ ছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বনির্ভর’ বলে গর্ব করেন, যদিও দেশটি কিছু পেট্রোলিয়াম পণ্যের আমদানির ওপর নির্ভরশীল, যার মধ্যে সামান্য পরিমাণ পণ্য হরমুজ দিয়ে আসে।
যুক্তরাষ্ট্র এই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে। হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প তাঁর উভয় মেয়াদেই বিভিন্ন দেশ, ব্যক্তি এবং কোম্পানির ওপর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে কঠোর ছিলেন। তিনি ২০১৮ সালে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, পরের বছর ভেনেজুয়েলার ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি প্রয়োগ করেন এবং একাধিক চীনা সংস্থার ওপর জরিমানা আরোপ করেন।
এই মেয়াদে ট্রাম্প ইরানের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন, আনুমানিক ২০ হাজার চীনা কোম্পানিকে অন্তর্ভুক্ত করে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ প্রসার করেছেন এবং চীনে উন্নত চিপ তৈরির সরঞ্জাম এবং জেট ইঞ্জিনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করেছেন।
তবে ইরান এবং চীনও যখন তাদের অর্থনৈতিক সুবিধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, তখন ট্রাম্প প্রশাসন অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে বিশ্লেষক হেনরি ফ্যারেল বলেছেন, ‘আমরা এমন এক বিশ্বে আছি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র যা করে পার পেয়ে যাবে বলে এত দিন বিশ্বাস করত, তা করে এখন আর পার পাচ্ছে না।’