ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে দূরে রাখার মিশনে বারবার হোঁচট খেলেও দক্ষিণ আমেরিকায় এক অভাবনীয় কূটনৈতিক ও সামরিক সাফল্যের দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত শুক্রবার মার্কিন জ্বালানি দপ্তর জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে একটি গবেষণা রি-অ্যাক্টর থেকে ১৩ দশমিক ৫ কেজি উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করে যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন জ্বালানি দপ্তরের ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রশাসক ব্র্যান্ডন উইলিয়ামস এই অভিযানকে ঐতিহাসিক হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আপসহীন এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণেই এই জটিল অপারেশন সফল হয়েছে। এটি আমেরিকা, ভেনেজুয়েলা এবং বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য একটি মাইলফলক।’
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই অভিযানে যুক্ত ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিশেষায়িত দল। সংস্থাটি জানিয়েছে, অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই ইউরেনিয়াম জল ও স্থলপথে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে উত্তর আমেরিকায় নেওয়া হয়। বর্তমানে এই তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলো সাউথ ক্যারোলাইনার একটি উচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন মার্কিন পারমাণবিক স্থাপনায় রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদিও ইরানের কাছে থাকা ৪০৮ কেজি উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের তুলনায় এই ১৩ দশমিক ৫ কেজি সামান্য, তবু এর প্রতীকী গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে গত ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে এই সাফল্যকে ট্রাম্প তাঁর বৈদেশিক নীতির বড় জয় হিসেবে ব্র্যান্ডিং করছেন।
গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের সমাজতান্ত্রিক শাসক নিকোলা মাদুরোকে আটকের নির্দেশ দেওয়ার পর থেকেই দেশটির রাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন শুরু হয়। ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে ভেনেজুয়েলার নতুন নেত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে এই স্বীকৃতির পেছনে রয়েছে কঠিন শর্ত। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, মার্কিন দাবি না মানলে রদ্রিগেজের পরিণতি মাদুরোর চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে।
এই সমঝোতার অংশ হিসেবেই সাত বছর পর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ফ্লাইট শুরু হয়েছে এবং কারাকাসে মার্কিন দূতাবাস পুনরায় খুলে দেওয়া হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফসহ একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সম্প্রতি কারাকাস সফর করেছেন।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপে মার্কিন জ্বালানি ও খনি সংস্থাগুলো ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলের মজুত (বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত মজুত) দখলের সুযোগ পাওয়ায় বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো উৎসবে মেতেছে। তবে গণতন্ত্রকামী কর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে গভীর উদ্বেগ।
নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী এবং নির্বাসিত বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদোকে পাশ কাটিয়ে ট্রাম্প যেভাবে দেলসি রদ্রিগেজকে কাছে টেনে নিয়েছেন, তাঁকে ‘স্বার্থের রাজনীতি’ বলে সমালোচনা করছেন মানবাধিকারকর্মীরা। তাঁদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন গণতন্ত্রের চেয়ে ভেনেজুয়েলার সম্পদ এবং কৌশলগত ইউরেনিয়াম সংগ্রহের দিকেই বেশি মনোযোগী।
এই ঘটনার পর তেহরানের প্রতিক্রিয়া কী হয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব। ইরানকে তাদের মজুত করা ইউরেনিয়াম সমর্পণে চাপ দিতে এই ঘটনাকে একটি ‘মডেল’ হিসেবে ব্যবহার করতে চায় ওয়াশিংটন। তবে সমালোচকেরা মনে করছেন, ভেনেজুয়েলায় যা সম্ভব হয়েছে, সামরিকভাবে শক্তিশালী ইরানে তা প্রয়োগ করা ট্রাম্পের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।