গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বিমান চলাচলের জ্বালানি বা ‘জেট ফুয়েল’-এর দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। বর্তমানে এর দাম যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১৮১ ডলারে পৌঁছেছে। জ্বালানির এই চরম সংকট ও উচ্চমূল্যের কারণে এয়ারলাইনসগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে—বিকল্প হিসেবে রান্নার তেল দিয়ে বিমান ওড়ানো সম্ভব কি না।
আজ রোববার (১০ মে) যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দি ইনডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে ইউরোপে জেট ফুয়েলের মজুত ৫০ শতাংশ কমে গেছে। গোল্ডম্যান স্যাকস সতর্ক করেছে, জুনের মধ্যে এই মজুত আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) নির্ধারিত ‘সংকটকালীন সীমা’র নিচে নেমে যেতে পারে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আগামী অক্টোবর পর্যন্ত ২০ হাজার ফ্লাইট বাতিল করেছে জার্মান পতাকাবাহী বিমান সংস্থা ‘লুফথানসা’। আমেরিকান এয়ারলাইনস ও ডেলটার মতো বড় সংস্থাগুলো কোটি কোটি ডলারের অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখে পড়েছে। সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় দেশটির স্পিরিট এয়ারলাইনস দেউলিয়া হয়ে গেছে।
এই সংকট কাটাতে দীর্ঘদিনের আলোচিত ‘সাসটেইনেবল অ্যাভিয়েশন ফুয়েল’ বা এসএএফের দিকে নতুন করে নজর দিচ্ছে বিশ্ব। এটি মূলত ব্যবহৃত রান্নার তেল, কৃষিবর্জ্য ও ক্যাপচার করা কার্বন থেকে তৈরি হয়। বর্তমানে ব্যবহৃত এসএএফের সিংহভাগই আসে রান্নার তেল থেকে। তবে এর বড় সীমাবদ্ধতা হলো সীমিত সরবরাহ। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বব্যাপী রান্নার তেল থেকে বড়জোর ২০ মিলিয়ন টন জ্বালানি পাওয়া সম্ভব, যা ২০৫০ সালের লক্ষ্যমাত্রার (২৫০-৫০০ মিলিয়ন টন) তুলনায় নগণ্য।
এদিকে রান্নার তেলের বাইরে আরও উন্নত প্রযুক্তি হিসেবে আসছে ই-এসএএফ। এতে সবুজ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে পানি থেকে উৎপাদিত হাইড্রোজেনের সঙ্গে কার্বন মিশিয়ে কৃত্রিম কেরোসিন তৈরি করা হয়। তাত্ত্বিকভাবে এর উৎপাদন সীমাহীন হলেও এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং বর্তমানে এর উৎপাদনক্ষমতা খুব কম।
গ্রিন ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউটের মাহেশ রায়ের মতে, বর্তমান সংকট জ্বালানি নিরাপত্তার সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে। এত দিন এসএএফ-কে শুধু পরিবেশ রক্ষার মাধ্যম হিসেবে দেখা হতো, কিন্তু ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি অবরোধের ফলে এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। যেসব এয়ারলাইনস আগে থেকেই এসএএফ ব্যবহারের চুক্তি করে রেখেছিল, তারা এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাব থেকে কিছুটা সুরক্ষিত।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রকল্পগুলো পূর্ণমাত্রায় কার্যকর হতে আরও চার-পাঁচ বছর সময় লাগবে। ২০৩৫ সালের মধ্যে পরিবেশগত নীতিমালা ও জ্বালানি খরচ বাড়ার কারণে এয়ারলাইনসগুলোর খরচ প্রায় চার গুণ বাড়তে পারে, যার চূড়ান্ত বোঝা বইতে হবে যাত্রীদেরই।
ইরান যুদ্ধ প্রমাণ করেছে, শুধু খনিজ তেলের ওপর নির্ভরতা বিমানশিল্পের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। রান্নার তেল বা ই-ফুয়েল এখন আর কেবল পরিবেশ বাঁচানোর শৌখিনতা নয়, বরং আকাশপথকে সচল রাখার এক অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।