যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গত সপ্তাহের সোমবার এক ফোনালাপে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে তিরস্কার করেন। কারণ, নেতানিয়াহু ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ বোমা হামলা দেশটির সরকারকে উৎখাত করতে পারে—এ সম্ভাবনাকে অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরেছিলেন।
স্থানীয় সময় গতকাল শুক্রবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়। সংবাদমাধ্যমটি এক মার্কিন ও এক ইসরায়েলি সূত্রের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন ওই সূত্রের ভাষ্য, যুদ্ধের আগে নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে—বিষয়টি সহজ হবে এবং সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি। সূত্রটি আরও বলেছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট এসব বক্তব্য সম্পর্কে যথেষ্ট বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখেছিলেন।
মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করেন, ইসরায়েলের কিছু কর্মকর্তা ভাইস প্রেসিডেন্টকে যথেষ্ট কড়া অবস্থানের বলে মনে করেন না। পাশাপাশি, যুদ্ধ বন্ধে নেতৃত্বমূলক ভূমিকা নেওয়ার প্রেক্ষাপটে তাকে দুর্বল করার চেষ্টাও চালানো হচ্ছিল। ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর, জেরুজালেমে তোলা একটি ছবির প্রসঙ্গও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা সন্দেহ করতে শুরু করেন, ইসরায়েলি সরকারের ভেতরের কেউ কেউ সোমবার বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও জেডি ভ্যান্সের মধ্যকার এক কঠিন ফোনালাপের পর ভ্যান্সকে নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা চালানোর চেষ্টা করছিল। সেই ফোনালাপে ভ্যান্স উল্লেখ করেন, যুদ্ধ নিয়ে নেতানিয়াহুর দেওয়া বেশ কিছু পূর্বাভাস বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি আশাবাদী প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষ করে, সরকার পতনের জন্য জনতার অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা নিয়ে তার মূল্যায়ন অতিরিক্ত ইতিবাচক ছিল বলে জানান এক ইসরায়েলি ও এক মার্কিন সূত্র।
এক মার্কিন সূত্র বলেন, ‘যুদ্ধের আগে বিবি (নেতানিয়াহুর ডাক নাম) প্রেসিডেন্টের কাছে বিষয়টিকে খুব সহজ হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্ট এসব বক্তব্যকে বাস্তব দৃষ্টিতে দেখেছেন।’
ওই ফোনালাপের পরদিনই রিপাবলিকান পার্টির বড় দাতা মিরিয়াম অ্যাডেলসনের মালিকানাধীন এক ডানপন্থী ইসরায়েলি পত্রিকা খবর প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার ইস্যুতে ভ্যান্স নাকি নেতানিয়াহুর ওপর চিৎকার করেছিলেন।
তবে একাধিক মার্কিন ও ইসরায়েলি সূত্র জানায়, এই প্রতিবেদনটি সঠিক নয়। ভ্যান্সের উপদেষ্টাদের সন্দেহ, খবরটি ইসরায়েলি পক্ষ থেকেই ফাঁস করা হয়েছিল। যদিও এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা এই অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যম যখন তাদের কাছে জানতে চেয়েছিল, তখন নেতানিয়াহুর দপ্তর বরং এই তথ্যকে অস্বীকারই করেছিল।
ওয়াশিংটনে অবস্থিত ইসরায়েলি দূতাবাস নেতানিয়াহু ও ভ্যান্সের মধ্যে কূটনৈতিক আলাপ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়।
এদিকে, ইসরায়েল ইরান যুদ্ধ বন্ধের ইস্যুতে ভ্যান্সের অবস্থান নিয়ে শঙ্কিত। এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে বলেন, ‘ইরান যদি ভ্যান্সের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারে, তাহলে তারা কোনো চুক্তিই পাবে না। তারা যা পেতে পারে, তার মধ্যে ভ্যান্সই সেরা।’ তবে একই প্রতিবেদনে ট্রাম্প প্রশাসনের আরেক কর্মকর্তা এই ধারণাকে নাকচ করেন যে, ভ্যান্স দ্রুত কোনো চুক্তি করে ইরান থেকে বেরিয়ে যেতে চান। তাঁর ভাষায়, ‘এটা জেডিকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলের একটি অপারেশন।’
এমন মন্তব্য এমন এক সময়ে প্রকাশ্যে এল, যখন খবর ছড়িয়েছে যে—ইরান ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা করতে আগ্রহী। ভ্যান্সের উপদেষ্টারাও সন্দেহ করছেন, তাঁর ইসরায়েলি সমালোচকেরাই হিব্রু ভাষার এক সংবাদে এমন দাবি ছড়িয়েছিল যে—পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান বসতি স্থাপনকারী সহিংসতা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় ভ্যান্স ফোনে নেতানিয়াহুকে ধমক দিয়েছিলেন। তবে মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এই দাবিকে অস্বীকার করেছেন।
ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়া সাবেক সেনা হিসেবে ভ্যান্স দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক জড়িত থাকার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করে আসছেন, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগেও তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে সন্দিহান সদস্যদের একজন ছিলেন। যুদ্ধের সময়কাল, লক্ষ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারের ওপর এর প্রভাব নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
তবে প্রকাশ্যে ভ্যান্স প্রশাসনের বাকি অংশের সঙ্গে সুর মিলিয়ে চলেছেন এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে বোমা হামলা শুরু করে, তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। এর আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছিল, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান যুদ্ধের আগে মূল্যায়ন করেছিলেন যে—অভিযান সফল হলে মোসাদ ও সিআইএ যৌথভাবে এমন একটি গণ-অভ্যুত্থান উসকে দিতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ইরানের সরকারকে উৎখাত করবে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে নেতানিয়াহু এই মোসাদ পরিকল্পনা হোয়াইট হাউসের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত না হওয়ায় এবং ট্রাম্প যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধ বন্ধ করে দিতে পারেন—এমন সম্ভাবনায় তিনি হতাশ।