যুক্তরাষ্ট্রে আগামী মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত হবে মধ্যবর্তী নির্বাচন (মিডটার্ম ইলেকশন)। এ নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভস) ও সিনেটের সদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নরসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন ভোটারেরা। ধারণা করা হচ্ছে, এবারের নির্বাচনে ১০ কোটির বেশি ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। নির্বাচন সামনে রেখে দেশজুড়ে, বিশেষ করে টেক্সাস, ওহাইও ও মিশিগানের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে রাজনৈতিক দলগুলো।
প্রেসিডেন্টের চার বছর মেয়াদি শাসনামলের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হয় মধ্যবর্তী নির্বাচন। এতে প্রেসিডেন্টের পদ নিয়ে ভোটাভুটি না হলেও তাঁর জনপ্রিয়তা ও নীতির প্রতি জনগণের সমর্থনের প্রতিফলন ঘটে। এবারের নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—রিপাবলিকান নাকি ডেমোক্র্যাটদের। রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে মেয়াদের শেষ দুই বছরে নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের মোট আসন ৪৩৫টি। জনসংখ্যার ভিত্তিতে অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে আসন বণ্টন করা হয়। সদস্যরা নির্বাচিত হন দুই বছরের জন্য। বর্তমানে দুটি আসন শূন্য থাকায় ও একজন স্বতন্ত্র সদস্য রক্ষণশীলদের পক্ষে ভোট দেওয়ায় রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে ২১৮-২১৪ ব্যবধানে।
এবার প্রতিনিধি পরিষদের সব কটি আসনে নির্বাচন হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি আসন বাড়াতে হবে। ফলে রিপাবলিকানদের কাছ থেকে আসন পুনরুদ্ধারে জোরালো প্রচার চালাচ্ছে দলটি।
সিনেটের মোট আসন ১০০টি। প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে দুজন করে সিনেটর ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি, ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি। এবার ৩৫টি আসনে নির্বাচন হবে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের আরও চারটি আসন অর্জন করতে হবে।
মেইন, ওহাইও, নর্থ ক্যারোলাইনা, আইওয়া, জর্জিয়াসহ অন্তত ১০টি অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী লড়াই সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মিশিগানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রিপাবলিকান মাইক রজার্সের বিরুদ্ধে। নির্বাচিত হলে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম-আমেরিকান সিনেটর। অন্যদিকে আলাস্কায় রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানের বিরুদ্ধে লড়ছেন ডেমোক্র্যাট মেরি পেলটোলা।
এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে ট্রাম্পের জনসমর্থন। তাঁর অনুমোদনের হার ৩০ শতাংশের মাঝামাঝি। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের অসন্তোষকে কাজে লাগাতে চাইছেন ডেমোক্র্যাটরা। তাঁদের অভিযোগ, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং সংঘাত অবসানে ট্রাম্প প্রশাসনের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই।
এপি-নর্ক পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, নিবন্ধিত ভোটারদের প্রায় ৮০ শতাংশ চান, নতুন কংগ্রেস জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিক। বিশেষ করে জ্বালানির দাম কমানো ও ইরান যুদ্ধের অবসান তাঁদের প্রত্যাশার শীর্ষে রয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। গাজা যুদ্ধের পর ডেমোক্র্যাটদের প্রগতিশীল অংশের অনেকেই ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবি তুলেছেন। ঐতিহ্যগতভাবে দুই দলের মধ্যেই ইসরায়েলের প্রতি জোরালো সমর্থন থাকলেও ডেমোক্র্যাট শিবিরে এই অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য বাড়ছে।
সব মিলিয়ে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণের লড়াই নয়; এটি ট্রাম্প প্রশাসনের জনপ্রিয়তা, ইরান যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যনীতি নিয়ে মার্কিন ভোটারদের মনোভাব যাচাইয়েরও গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।