কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে প্রযুক্তি দুনিয়ার উচ্ছ্বাসে নতুন প্রজন্মের অনেক শিক্ষার্থী আর আস্থা রাখতে পারছেন না। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সম্প্রতি এআই প্রসঙ্গ উঠতেই শিক্ষার্থীদের প্রকাশ্য বিরক্তি ও প্রতিবাদ সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। প্রযুক্তি নেতারা যখন এআইকে ভবিষ্যতের বিপ্লব হিসেবে তুলে ধরছেন, তখন অনেক শিক্ষার্থী এটিকে দেখছেন অনিশ্চিত চাকরির বাজার, সামাজিক অবক্ষয় এবং মানবিক সংকটের প্রতীক হিসেবে।
ঘটনার শুরু ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডায়। সমাবর্তন বক্তৃতায় ট্যাভিস্টক ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট গ্লোরিয়া কউলফিল্ড বলেন, ‘এআই-এর উত্থানই পরবর্তী শিল্পবিপ্লব।’ বক্তব্য শেষ হওয়ার আগেই শিক্ষার্থীদের একাংশ জোরে জোরে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করলেও এআই-এর ‘ক্ষমতা এখন আমাদের হাতের মুঠোয়’—এমন মন্তব্যে আবারও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
শুক্রবার (২২ মে) ‘স্লেট’ জানায়, একই ধরনের ঘটনা ঘটে আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। মিডল টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে বিগ মেশিন রেকর্ডসের প্রধান নির্বাহী স্কট বোরচেটা এআইকে সংগীত শিল্পের ভবিষ্যৎ বলে উল্লেখ করেন। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের মুখে তিনি বলেন, ‘এটা মেনে নিন।’ ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনায় সাবেক গুগল প্রধান এরিক শ্মিটের বক্তব্যেও এআই প্রসঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষার্থীদের বিরোধিতা চলতে থাকে। একই দিনে ফিনিক্সের গ্লেনডেল কমিউনিটি কলেজে একটি ‘এআই ঘোষক’ কয়েকজন শিক্ষার্থীর নাম ভুল উচ্চারণ করলে অনুষ্ঠান বন্ধ রেখে আবার নাম ঘোষণা করতে হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিক্রিয়া হঠাৎ তৈরি হয়নি। ২০২২ সালে চ্যাটজিপিটি জনপ্রিয় হওয়ার পর থেকেই বর্তমান শিক্ষার্থীরা এআই-এর প্রভাব সরাসরি অনুভব করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন এবং বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে এআই নিয়ে প্রচারণা চললেও বাস্তবে তারা দেখছে চাকরির সংকট, তথ্য বিভ্রান্তি, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং মানবিক সম্পর্কের অবক্ষয়।
অনেক শিক্ষার্থীর কাছে এআই এখন শুধু প্রযুক্তি নয়, বরং ভয় ও অনিশ্চয়তার প্রতীক। চাকরিপ্রার্থীরা আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে তাদের মূল্যায়ন করবে পক্ষপাতদুষ্ট অ্যালগরিদম। নারী ও ট্রান্সজেন্ডার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিপফেক প্রযুক্তি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অন্যদিকে প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনা করা অনেক শিক্ষার্থী মনে করছেন, এআই শিল্পে কাজ মানে অনৈতিক করপোরেট সংস্কৃতির সঙ্গে আপস করা।
তবে সব শিক্ষার্থী যে এআইবিরোধী, তা নয়। অনেকেই পড়াশোনায় চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করছেন। তবুও সাম্প্রতিক জরিপগুলো বলছে, তরুণদের বড় একটি অংশ এআইকে ভবিষ্যতের জন্য হুমকি হিসেবেই দেখছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেও ভিন্ন সুর শোনা গেছে ডেলটা এয়ারলাইনসের প্রধান নির্বাহী এড বাস্তিয়ানের বক্তব্যে। অ্যামোরি ইউনিভার্সিটির সমাবর্তনে তিনি স্বীকার করেন, বক্তৃতা লেখার জন্য প্রথমে জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু পরে সেটি বাদ দেন, কারণ লেখাটিতে ‘আত্মিক উষ্ণতার অভাব’ ছিল। তাঁর এই স্বীকারোক্তি শিক্ষার্থীদের ব্যাপক করতালিতে সাড়া ফেলে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিক্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে—প্রযুক্তির অগ্রগতির মাঝেও তরুণ প্রজন্ম এখনো মানবিক স্পর্শ, সত্যিকারের অনুভূতি এবং মানুষের কণ্ঠকেই বেশি মূল্য দিচ্ছে।