যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি থেকে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার দূরে, ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী সেন্ট থমাস-এর দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ৭২ একরের ছোট্ট দ্বীপ লিটল সেন্ট জেমস। সাদা বালির সৈকত, নারকেল গাছ, নীলাভ সমুদ্র আর ঢেউখেলানো টিলা—সব মিলিয়ে এক নিভৃত স্বর্গ। আকাশ থেকে তোলা ছবিতে দেখা যায় নীল ছাদের বাড়ি, পশ্চিম প্রান্তে সুইমিং পুল, পূর্বদিকে হেলিপ্যাড সদৃশ অবকাঠামো।
কিন্তু এই স্বর্গই পরিণত হয়েছিল ভয়ংকর অপরাধের কেন্দ্রে। অভিযোগ ওঠে, বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এখানে বিলাসবহুল আয়োজনের আড়ালে নারী ও কিশোরীদের যৌন নির্যাতন করতেন। এর মধ্যে কিছু ভুক্তভোগীর বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। কারও কারও দাবি, এসব ভুক্তভোগীকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকেও আনা হয়েছিল।
সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশ করা লাখ লাখ নথি থেকে এই দ্বীপের কথা জানতে পেরেছে বিশ্ববাসী। এই দ্বীপেরই মালিক ছিলেন যৌন অপরাধী ও মার্কিন অর্থলগ্নিকারী জেফরি এপস্টেইন। ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউইয়র্কের কারাগারে বিচারাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন নির্যাতনের দায় স্বীকার করার পর সেই সময়টিতে তিনি মানবপাচার মামলার মুখোমুখি ছিলেন। কারাগারের ভেতর তাঁর রহস্যময় মৃত্যু, তাঁর সম্পর্কে নথিপত্রের স্তূপ এবং এসব নথিপত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম—সব মিলিয়ে এপস্টেইনের কাহিনি এখনো বিশ্বকে নাড়া দিচ্ছে।
১৯৯৮ সালে আনুমানিক ৮ মিলিয়ন ডলারে কেনা দ্বীপটিতে একটি মূল ভবন, অতিথিশালা, ডক ও কর্মীচারীদের আবাসন ছিল। ২০১০ সালের মধ্যে এপস্টেইন সেখানে ব্যাপক সংস্কার করেছিলেন। স্থাপন করা হয় নতুন ভিলা, পাথরের কটেজ, সুইমিং পুল এবং এক অদ্ভুত নীল-সাদা ডোরাকাটা ঘর, যাকে কেউ কেউ ‘টেম্পল’ বলতেন। সরকারি নথিতে এটি ‘মিউজিক প্যাভিলিয়ন’ হিসেবে উল্লেখ থাকলেও নির্মিত ওই কাঠামোর সঙ্গে নকশার মিল ছিল না। জানালাবিহীন এই ভবন নিয়ে এখন নানা জল্পনা-কল্পনা ছড়াচ্ছে।
মার্কিন বিচার বিভাগ সম্প্রতি ওই দ্বীপের যেসব ছবি প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায় বিলাসবহুল শয়নকক্ষ, দৃষ্টিনন্দন বাথরুম, রেস্তোরাঁ-মানের রান্নাঘর এবং পরিচ্ছন্ন বাগান। এক কক্ষে দাঁতের চিকিৎসার চেয়ারও পাওয়া গেছে, যা নিয়ে নানা ভয়াবহ অনুমান ছড়িয়ে পড়েছে।
দ্বীপটিতে বিমান অবতরণের সুযোগ না থাকায় অতিথিরা যেতেন নৌকায় চড়ে। তবে মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত ৩০ লাখের বেশি নথিতে ওই দ্বীপে যাতায়াত করা অতিথিদের সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। সেখানে যাতায়াত করা বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির নামও উঠে আসে। তাঁদের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স অ্যান্ড্রুর নামও রয়েছে।
এ ছাড়া ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ, অভিনেতা উডি অ্যালান ও কেভিন স্পেসির নামও বিভিন্ন নথিতে উল্লেখ আছে। এমনকি একাধিক যৌন নিপীড়ন মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলিউড প্রযোজক হার্ভে ওয়েনস্টেইনের নামও এই তালিকায় আছে।
তবে নথিতে নাম থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণিত—এমন নয়। অনেকেই এপস্টেইনের সঙ্গে অনৈতিক কাজে জড়িত হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এপস্টেইনের সঙ্গী ও ব্রিটিশ অভিজাত শ্রেণির বখে যাওয়া নারী গিলেইন ম্যাক্সওয়েল বর্তমানে কারাগারে দণ্ড ভোগ করছেন। এই অপরাধী জুটির শিকার ভার্জিনিয়া জিউফ্রে গত বছরের এপ্রিলে আত্মহত্যা করেন। তবে আত্মহত্যার আগে তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় লিখে গেছেন—তাঁকে বহু ধনী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তির কাছে পাঠানো হতো। আরেক ভুক্তভোগী সারাহ র্যানসম তাঁর ‘সাইল্যান্সড নো মোর’ বইয়ে দাবি করেছেন, অভিযোগ জানালে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
জানা গেছে, এপস্টেইনের সেই দ্বীপ খুব শিগগিরই বদলে যেতে পারে। ২০২৩ সালের মে মাসে তাঁর লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপ সহ ও পাশের গ্রেট সেন্ট জেমস দ্বীপটিও ৬ কোটি ডলারে বিক্রি করা হয়েছে মার্কিন বিনিয়োগকারী স্টিফেন ডেকফ-এর কাছে। দ্বীপ দুটিকে বিশ্বমানের ক্যারিবীয় রিসোর্টে রূপান্তরের কাজ এখন এগিয়ে চলছে।