পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশে গত শুক্রবার গভীর রাতে একযোগে ১২টি স্থানে হামলা চালায় বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীরা। এই হামলার পর থেকে গত ৪০ ঘণ্টায় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ১৪৫ জন জঙ্গি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ বুগতি। আজ রোববার কোয়েটায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গত শুক্রবার ও গতকাল শনিবার পরিচালিত অভিযানে এবং চলমান তল্লাশি ও ক্লিয়ারেন্স অপারেশনে এই জঙ্গিরা নিহত হয়েছেন।
এর আগে গতকাল পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, এক দিনেই ৯২ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে।
সরফরাজ বুগতি দাবি করেন, স্বল্প সময়ে এত বিপুলসংখ্যক জঙ্গি নিহত হওয়ার ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিরল। তবে তিনি অতীতের কোনো পরিসংখ্যান উল্লেখ করেননি। হামলায় ১৭ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং ৩১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলেও জানান তিনি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় হলেও সবচেয়ে দরিদ্র প্রদেশ। ইরান ও আফগানিস্তান সীমান্তঘেঁষা খনিজসম্পদসমৃদ্ধ এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই জাতিগত বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নেতৃত্বে বিদ্রোহ চলছে। এসব গোষ্ঠী স্বায়ত্তশাসন ও প্রাকৃতিক সম্পদের ন্যায্য হিস্যা দাবি করে আসছে।
এদিকে এই হামলার দায় স্বীকার করেছে নিষিদ্ধঘোষিত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। সংগঠনটি জানিয়েছে, গত শুক্রবার গভীর রাত থেকে ‘হেরফ’ বা ‘ব্ল্যাক স্টর্ম’ নামের এই অভিযানে তারা কোয়েটা, গোয়াদর, মাস্তুং, নুশকিসহ প্রদেশের অন্তত ১২টি স্থানে একযোগে হামলা চালায়। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সামরিক ঘাঁটি, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং মহাসড়কগুলোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনী গতকাল এক বিবৃতিতে দাবি করে, এসব হামলা ‘ভারত-সমর্থিত জঙ্গিরা’ চালিয়েছেন। তবে আজ রোববার ভারত এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘পাকিস্তানের এ ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ আমরা স্পষ্টভাবে নাকচ করছি।’ তিনি আরও বলেন, ইসলামাবাদের উচিত নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যার দিকে নজর দেওয়া এবং ওই অঞ্চলের জনগণের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো সমাধান করা।
নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানায়, হামলার পর একাধিক জেলায় একযোগে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট যৌথ অভিযান চালায়। কয়েকটি জেলার হাসপাতালে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।
পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজের (পিআইপিএস) বিশ্লেষক আবদুল বাসিত বলেন, বেলুচিস্তানে একসঙ্গে এতগুলো এলাকায় হামলা প্রমাণ করে যে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো এখনো শক্তিশালী সংগঠনকাঠামো ধরে রেখেছে। শুধু সামরিক অভিযানে নয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমাধান ছাড়া এই সংকট দীর্ঘ মেয়াদে মোকাবিলা করা কঠিন।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, কোনো শহর বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দখলের জঙ্গি প্রচেষ্টা সফল হতে দেওয়া হয়নি। তবে দেশটির অন্যান্য অংশেও ইসলামপন্থী জঙ্গিদের হামলার ঝুঁকি রয়ে গেছে, বিশেষ করে পাকিস্তানি তালেবান-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।