ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি। এই অচলাবস্থা কাটাতে এবং সমুদ্রপথ পুনরায় খুলে দিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মাইন অপসারণ অভিযান শুরুর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। তবে ইরানের পেতে রাখা আধুনিক মাইন এবং সেগুলোর অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা এই অভিযানকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের বড় যুদ্ধজাহাজগুলোর অধিকাংশ ধ্বংস হয়ে গেলেও তেহরান তাদের ছোট নৌযানগুলো ব্যবহার করে হরমুজের বিভিন্ন অংশে মাইন পেতে রেখেছে। যদিও মাইনের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি, তবে ইরান কেবল সেই সব জাহাজকে যাতায়াতের সুযোগ দিচ্ছে, যারা নির্দিষ্ট মাশুল বা ‘টোল’ পরিশোধ করছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের বরাতে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরান নিজেই এখন সব মাইনের সঠিক অবস্থান শনাক্ত করতে পারছে না এবং সেগুলো অপসারণের সক্ষমতাও তাদের নেই। ড্রোন, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং দ্রুতগামী ছোট নৌযানের পাশাপাশি এই মাইনগুলোই এখন ইরানের প্রধান প্রতিরক্ষা অস্ত্র।
হরমুজে কী ধরনের মাইন পেতে রেখেছে ইরান
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান মূলত দুই ধরনের আধুনিক মাইন হরমুজে পেতে রেখেছে।
মাহাম-৩: এটি একটি নোঙর করা ৩০০ কেজি ওজনের মাইন, যা ১০০ মিটার গভীর পর্যন্ত কাজ করতে পারে।
মাহাম-৭: ২২০ কেজি ওজনের মাইনটি সমুদ্রের তলদেশে অবস্থান করে। এর শঙ্কু আকৃতির নকশাটি এমনভাবে তৈরি, যাতে শনাক্তকরণ এড়ানো যায়।
এই দুটি মাইনই আধুনিক সেন্সরযুক্ত, যা জাহাজের সংস্পর্শে না এসেও কেবল চৌম্বকীয় বা শব্দতরঙ্গের মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম। নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্টে বলা হয়েছে, নৌবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরানের হাতে এখনো ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ছোট মাইনবাহী নৌকা অক্ষত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মাইন অপসারণ পরিকল্পনা ও ঝুঁকি
মাইন পাতা সহজ হলেও তা পরিষ্কার করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও বিপজ্জনক। যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে মাইন পরিষ্কারকারী জাহাজগুলো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের সহজ লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এই ঝুঁকি এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কয়েকটি বিকল্প রয়েছে।
ওয়াশিংটনের রয়েছে চালকবিহীন জলযান ‘নাইফফিশ’। এটি পানির নিচের মাইনশিকারি ড্রোন। এ ছাড়া হরমুজের মাইন অপসারণে যুক্তরাষ্ট্র ‘এমসিএম’ নামক দ্রুতগামী চালকবিহীন নৌযানও ব্যবহার করতে পারে।
আর্চারফিশ একটি মাইন ধ্বংসকারী সিস্টেম। এটি এমএইচ-৬০এস হেলিকপ্টার থেকে ব্যবহার করা যায় যা, সহজেই মাইন শনাক্ত করে ধ্বংস করতে পারে।
যদিও এই পদ্ধতিতে মানুষের জীবনের ঝুঁকি কম, তবে ড্রোনগুলো নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মার্কিন জাহাজ বা হেলিকপ্টারকে মাইনের কাছাকাছি থাকতে হয়। ফলে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হলে সেগুলো ইরানি ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় পড়ার ঝুঁকিতে থেকে যায়।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ মাইনের মাধ্যমে বন্ধ করা নিষিদ্ধ। তবে ইরান হরমুজ প্রণালির একাংশকে নিজেদের আঞ্চলিক জলসীমা বলে দাবি করে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কেউই ১৯৯৪ সালের জাতিসংঘ সমুদ্র আইন সনদে স্বাক্ষর করেনি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, যেহেতু দুই দেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে, তাই ইরান তাদের মাইনের বিস্তারিত মানচিত্র যুক্তরাষ্ট্রের হাতে দেবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান