ইরানের আকাশসীমায় ভূপাতিত মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ ক্রু সদস্যকে খুঁজে বের করতে দেশটির অভ্যন্তরে এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ এবং ‘শ্বাসরুদ্ধকর’ উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষায়িত বাহিনী। প্রাথমিক তথ্যে বিমানের একজন পাইলটকে উদ্ধারের খবর পাওয়া গেলেও দ্বিতীয় সদস্যের সন্ধানে এখনো ইরানি ভূখণ্ডের গভীরে চিরুনি তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ওই মার্কিন পাইলটকে জীবিত ধরিয়ে দিতে পারলে ১০ বিলিয়ন তুমান (প্রায় ৭৬ হাজার ডলার) পুরস্কার ঘোষণা করেছে ইরান।
এই বিশেষ ধরনের অভিযানকে সামরিক পরিভাষায় ‘কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ’ (সিএসএআর) বলা হয়, যা আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম জটিল এবং সময়সাপেক্ষ সামরিক অপারেশন।
কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ আসলে কী?
সাধারণ অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের সঙ্গে এর মূল পার্থক্য হলো—এটি দুর্যোগপূর্ণ মানবিক পরিবেশে নয়, বরং সরাসরি শত্রুভাবাপন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিচালিত হয়। যখন কোনো পাইলট বা সৈন্য শত্রু শিবিরের সীমানায় বা দুর্গম এলাকায় আটকা পড়েন, তখন তাদের জীবিত ও নিরাপদে ফিরিয়ে আনাই এই মিশনের মূল লক্ষ্য। ইরানে শুক্রবারের এই উদ্ধার অভিযানটি সরাসরি শত্রুপক্ষের রাডার এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নজর এড়িয়ে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
প্যারা-রেসকিউ জাম্পার স্কোয়াড্রনের একজন সাবেক কমান্ডার সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, এই উদ্ধার অভিযানে অন্তত ২৪ জন বিশেষ প্রশিক্ষিত প্যারা-রেসকিউ জাম্পার অংশ নিচ্ছেন। তাঁরা ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার ব্যবহার করে এলাকাটি চষে বেড়াচ্ছেন এবং প্রয়োজনে চলন্ত বিমান থেকে প্যারাস্যুটের মাধ্যমে যেকোনো ভূখণ্ডে ঝাঁপ দিতে প্রস্তুত। তাঁদের প্রথম ও প্রধান কাজ হলো নিখোঁজ সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা, তাঁকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দেওয়া এবং শত্রুর নাগালের বাইরে কোনো নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া যেখান থেকে তাঁদের উদ্ধার করা সম্ভব।
‘এয়ারফোর্সের সুইস আর্মি নাইফ’: প্যারা-রেসকিউ জাম্পারদের প্রশিক্ষণ মার্কিন বিমানবাহিনীর এই প্যারা-রেসকিউ জাম্পাররা একাধারে দক্ষ যোদ্ধা এবং সার্টিফায়েড প্যারামেডিক। তাঁদের প্রশিক্ষণের প্রক্রিয়াটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন বলে বিবেচিত, যা শেষ করতে প্রায় দুই বছর সময় লাগে। তাদের প্রশিক্ষণের মধ্যে রয়েছে:
প্যারাস্যুট ও ডাইভিং: যেকোনো উচ্চতা থেকে ঝাঁপ দেওয়া এবং পানির গভীরে গিয়ে কাজ করার সক্ষমতা।
আন্ডারওয়াটার ডিমোলিশন: পানির নিচে বিস্ফোরক ব্যবহার ও প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা।
এসইআরই প্রশিক্ষণ: প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকা (Survival), শত্রুর চোখ ফাঁকি দেওয়া (Evasion), প্রতিরোধ গড়ে তোলা (Resistance) এবং পালিয়ে আসা (Escape)।
ব্যাটলফিল্ড মেডিসিন: যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুতর আহতদের জীবন রক্ষাকারী জরুরি চিকিৎসা প্রদান।
এই বাহিনীর মূলমন্ত্র হলো—‘অন্যরা যেন বাঁচতে পারে, সে জন্যই আমরা কাজ করি’। এটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেই অঙ্গীকারের প্রতিফলন, যেখানে বলা হয় কোনো সদস্যকেই যুদ্ধের ময়দানে ফেলে আসা হবে না।
উদ্ধার অভিযানের দীর্ঘ ইতিহাস
আকাশপথে যুদ্ধকালীন উদ্ধার অভিযানের ইতিহাস প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু। আধুনিক সিএসএআর প্রতিষ্ঠিত হয় ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়। ‘ব্যাট ২১’ নামক একটি বিখ্যাত মিশন এই ধরনের অভিযানের গুরুত্ব বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছিল। সাম্প্রতিক ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উদ্ধার অভিযান হলো:
১৯৯৫ (বসনিয়া) : মার্কিন পাইলট স্কট ও’গ্র্যাডিকে ছয় দিন শত্রু সীমানায় আত্মগোপন করে থাকার পর উদ্ধার করা হয়।
১৯৯৯ (সার্বিয়া) : ভূপাতিত এফ-১১৭ স্টেলথ ফাইটারের পাইলটকে সাহসিকতার সঙ্গে উদ্ধার করে প্যারা-রেসকিউ দল।
২০০৫ (আফগানিস্তান) : নৌবাহিনীর সিল সদস্যকে উদ্ধারের সেই বিখ্যাত মিশন, যা পরবর্তীতে ‘লোন সারভাইভার’ চলচ্চিত্রে চিত্রিত হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতির চরম চ্যালেঞ্জ
সাবেক মার্কিন মেরিন কর্পস স্পেশাল অপারেশন বিশেষজ্ঞ জোনাথন হাকেট জানিয়েছেন, উদ্ধারকারী দলকে এখন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। কারণ ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীও একই এলাকায় নিখোঁজ মার্কিন পাইলটকে খুঁজে বের করার জন্য অভিযান চালাচ্ছে। যদি শত্রুপক্ষ আগে পাইলটকে পেয়ে যায়, তবে পরিস্থিতি চরম কূটনৈতিক ও সামরিক সংকটের দিকে মোড় নিতে পারে।
ভেরিফায়েড ভিডিও ফুটেজে ইরানের খুজেস্তান প্রদেশের আকাশে মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টার ও অন্তত একটি রিফুয়েলিং এয়ারক্রাফট উড়তে দেখা গেছে। এই মিশনে হেলিকপ্টারগুলোর জ্বালানি সরবরাহের জন্য আকাশে ভাসমান রিফুয়েলিং বিমানের উপস্থিতি অভিযানের ভয়াবহতা ও দীর্ঘসূত্রতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি একটি ‘নন-স্ট্যান্ডার্ড অ্যাসিস্টেড রিকভারি মিশন’ হতে পারে, যেখানে প্রয়োজনে স্থানীয় বন্ধুত্বপূর্ণ গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে পূর্বের চুক্তি অনুযায়ী সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।