যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত মঙ্গলবার এক উত্তপ্ত ফোনালাপে যুক্ত হয়েছিলেন। এ সময় তাঁরা ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর নতুন প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে তিনটি সূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যে একটি সূত্রের ভাষায়, ফোনালাপের পর নেতানিয়াহুর ‘মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিল’ অর্থাৎ তিনি ভীষণ উত্তেজিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রগুলো জানিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার মতপার্থক্য কমানোর চেষ্টা হিসেবে কাতার ও পাকিস্তান একটি সংশোধিত শান্তি-স্মারক খসড়া তৈরি করেছে। এতে আঞ্চলিক অন্য মধ্যস্থতাকারীদেরও মতামত যুক্ত করা হয়েছে। এমন একসময়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হলো, যখন ট্রাম্প একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলার নির্দেশ দেবেন কি না, তা নিয়ে দোদুল্যমান অবস্থায় আছেন, অন্যদিকে এখনো একটি চুক্তির আশাও ধরে রেখেছেন।
নেতানিয়াহু এই আলোচনার বিষয়ে অত্যন্ত সন্দিহান। তিনি যুদ্ধ আবার শুরু করতে চান, যাতে ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করা যায় এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করে দেশটির শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে ট্রাম্প এখনো বলে চলেছেন যে তিনি মনে করেন একটি চুক্তি সম্ভব। তবে সেটি না হলে যুদ্ধ পুনরায় শুরুর জন্যও তিনি প্রস্তুত।
স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার কোস্ট গার্ড একাডেমিতে ট্রাম্প বলেন, ‘এখন একটাই প্রশ্ন, আমরা কি গিয়ে বিষয়টা পুরোপুরি শেষ করব, নাকি তারা একটি নথিতে সই করবে। দেখা যাক কী হয়।’ পরে বুধবারই তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ‘একটি চুক্তি এবং যুদ্ধ পুনরায় শুরুর মাঝখানের সীমারেখায় দাঁড়িয়ে আছে’।
ট্রাম্প আরও বলেন, ইরান ইস্যুতে নেতানিয়াহু ‘আমি যা চাইব, তা-ই করবে’। যদিও একই সঙ্গে তিনি বলেন, তাঁদের সম্পর্ক ভালো। ইরানকে ঘিরে এর আগেও দুই নেতার মধ্যে সাময়িক মতবিরোধ হয়েছিল, তবে পুরো যুদ্ধকালজুড়ে তারা ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মধ্যেই ছিলেন।
এদিকে, ইরান নিশ্চিত করেছে যে তারা হালনাগাদ প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে। তবে এখন পর্যন্ত নিজেদের অবস্থানে নমনীয় হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখায়নি। তিনটি সূত্র জানিয়েছে, কয়েক দিনে পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসর প্রস্তাবটি আরও পরিমার্জনের কাজ করেছে, যাতে দুই পক্ষের ব্যবধান কমানো যায়।
দুই আরব কর্মকর্তা ও একটি ইসরায়েলি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কাতার সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কাছে একটি নতুন খসড়া উপস্থাপন করেছে। তবে চতুর্থ একটি সূত্র বলেছে, এটি আলাদা কোনো কাতারি খসড়া নয় বরং আগের পাকিস্তানি প্রস্তাবের ফাঁকগুলো পূরণের চেষ্টা করছে কাতার।
এক আরব কর্মকর্তা জানান, সর্বশেষ খসড়া নিয়ে ইরানিদের সঙ্গে আলোচনার জন্য কাতার এ সপ্তাহের শুরুতে একটি প্রতিনিধিদল তেহরানে পাঠিয়েছিল। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুধবার জানিয়েছে, ‘ইরানের ১৪ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে’ আলোচনা চলছে এবং মধ্যস্থতায় সহায়তার জন্য পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তেহরানে অবস্থান করছেন। এক সপ্তাহেরও কম সময়ে এটি তার দ্বিতীয় সফর।
এক আরব কর্মকর্তা বলেন, নতুন এই প্রচেষ্টার লক্ষ্য হলো ইরানের কাছ থেকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আরও স্পষ্ট ও বাস্তবধর্মী প্রতিশ্রুতি আদায় করা এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিস্তারিত জানা, কীভাবে ধাপে ধাপে ইরানের জব্দকৃত অর্থ ছাড় করা হবে। তিনটি সূত্রই জোর দিয়ে বলেছে, ইরান নতুন খসড়ায় রাজি হবে কি না, বা নিজেদের অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এক কাতারি কূটনীতিক বলেন, ‘আগেও যেমন বলা হয়েছে, কাতার পাকিস্তানের নেতৃত্বাধীন মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছে এবং এখনো করছে। আমরা ধারাবাহিকভাবে অঞ্চল ও এখানকার মানুষের স্বার্থে উত্তেজনা কমানোর পক্ষে কথা বলে আসছি।’
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ট্রাম্প নেতানিয়াহুর সঙ্গে ‘দীর্ঘ’ ও ‘উত্তপ্ত’ ফোনালাপ করেন। ফোনালাপ সম্পর্কে অবগত এক মার্কিন সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে বলেছেন যে মধ্যস্থতাকারীরা একটি ‘লেটার অব ইনটেন্ট’ বা অভিপ্রায়পত্র তৈরির কাজ করছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই সই করবে, যার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করা হবে এবং ৩০ দিনের আলোচনার একটি সময়সীমা শুরু হবে। ওই আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
দুটি ইসরায়েলি সূত্র জানিয়েছে, পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে দুই নেতার মধ্যে মতবিরোধ ছিল। ফোনালাপ সম্পর্কে অবগত মার্কিন সূত্রটি বলেছে, ‘কলের পর বিবির (নেতানিয়াহুর ডাকনাম) মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিল।’ সূত্রটি আরও জানায়, ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত মার্কিন আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছিলেন যে নেতানিয়াহু ওই ফোনালাপ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে দূতাবাসের এক মুখপাত্র এই দাবি অস্বীকার করে বলেন, ‘রাষ্ট্রদূত ব্যক্তিগত আলাপ নিয়ে মন্তব্য করেন না।’
দুটি সূত্র উল্লেখ করেছে, আলোচনা প্রক্রিয়ার আগের ধাপগুলোতেও নেতানিয়াহু অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিলেন, যদিও শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি। এক সূত্রের ভাষায়, ‘বিবি সব সময়ই উদ্বিগ্ন থাকে।’
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, আলোচনা সফল করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানি জাহাজের বিরুদ্ধে তাদের ‘জলদস্যুতা’ বন্ধ করতে হবে এবং জব্দ করা অর্থ ছাড়ে সম্মত হতে হবে। একই সঙ্গে ইসরায়েলকে লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা যদি সঠিক উত্তর না পাই, তাহলে যুদ্ধ খুব দ্রুত আবার শুরু হতে পারে।’ তবে তিনি আলোচনাকে আরও কয়েক দিন সময় দিতে প্রস্তুত। তাঁর ভাষায়, ‘আমি যদি কয়েক দিন অপেক্ষা করে মানুষকে নিহত হওয়া থেকে বাঁচাতে পারি, তাহলে সেটা খুবই ভালো কাজ হবে।’
এই প্রতিবেদন নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে হোয়াইট হাউস ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। তবে এক ইসরায়েলি সূত্র জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের জন্য ওয়াশিংটন সফরে যেতে চান নেতানিয়াহু।