মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস বা শান্তি পরিষদ দক্ষিণ গাজায় একটি পরীক্ষামূলক ‘মানবিক অঞ্চল’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। এর লক্ষ্য হলো যাচাই-বাছাই (ভেটিং) সম্পন্ন হওয়া কয়েক লাখ খানেক ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিককে সেখানে আশ্রয় দেওয়া। বোর্ডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বার্তা সংস্থা এএফপিকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার আওতায় যুদ্ধ-পরবর্তী অন্তর্বর্তী পর্যায়ে গাজার দৈনন্দিন প্রশাসনের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য গঠিত ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট কমিটির কার্যক্রম শুরু করার ক্ষেত্রে এই অঞ্চলটি একটি ‘প্রাথমিক সূচনা’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
বোর্ড অব পিসের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দক্ষিণ গাজার রাফাহে এই পরীক্ষামূলক অঞ্চল গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। এলাকাটির নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে বোর্ড অব পিসের অধীন পরিচালিত নবগঠিত সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্সের (আইএসএফ) বহুজাতিক সেনারা।
বোর্ড অব পিসের উদ্যোগে গঠিত ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের সংগঠন ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি) অঞ্চলটিতে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব পালন করবে। এ কাজে তাদের সহায়তা করবে আইএসএফ।
তবে বদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত মানবিক অঞ্চল তৈরির ধারণাটি কয়েক মাস ধরেই বিতর্কের বিষয়। গাজায় কর্মরত কূটনীতিক ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এএফপি-কে বলেছেন, তাঁদের মতে এ ধরনের ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যদিও বোর্ডের ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, ‘সব নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের জন্য এই অঞ্চলে প্রবেশ ও বের হওয়া অবাধই থাকবে।’
মার্কিন সমর্থিত গাজা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা কয়েক মাস ধরে স্থবির হয়ে রয়েছে। এদিকে গাজার অন্তর্বর্তী প্রশাসনের জন্য গঠিত এনসিএজি এখনো কায়রোতে অবস্থান করছে এবং এখনও গাজা ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারেনি। গত অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় নিজেদের উপস্থিতি আরও বিস্তৃত করেছে। বর্তমানে তারা গাজা ভূখণ্ডের ৬০ শতাংশেরও বেশি এলাকার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
পরিকল্পনার বিষয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘বিশেষ করে আমরা একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প নিয়ে ভাবছি, যার মাধ্যমে এনসিএজি একটি প্রাথমিক ভিত্তি পেতে পারে। যারা স্বেচ্ছায় আসতে চাইবে, এমন কয়েক দশ হাজার মানুষকে এই এলাকায় নিয়ে আসা যাবে এবং তাঁদের এমন একটি পরিসর দেওয়া যাবে, যেখানে তারা কার্যকরভাবে প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে এবং তারাই হবে প্রশাসন।’
প্রকল্পের অবস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, রাফাহ এলাকাকে বিবেচনা করা হচ্ছে, তবে সুনির্দিষ্ট স্থান এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এছাড়া এখনো কোনো ধরনের নির্মাণকাজও শুরু হয়নি। গাজার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত রাফাহ যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এলাকাটির অধিকাংশই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ওই কর্মকর্তার ভাষায়, আইএসএফ ফিলিস্তিনি জনগণ এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মধ্যে ‘এক ধরনের বাফার’ বা নিরাপত্তা-বেষ্টনী হিসেবে কাজ করবে। তিনি বলেন, ‘একটি যাচাই-বাছাই ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে যে কোনো সশস্ত্র ব্যক্তি বা যোদ্ধা এই নিরাপদ মানবিক অঞ্চলগুলোতে প্রবেশ করতে না পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই দায়িত্ব ইসরায়েলি সেনাবাহিনী পালন করবে না। বেসামরিক জনগণের সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের যোগাযোগ থাকবে না এবং গাজার বাকি অংশ থেকে এই এলাকাগুলোকে পৃথক রাখার ক্ষেত্রেও তাদের কোনো ভূমিকা থাকবে না।’
মার্কিন সমর্থিত গাজা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চলতি বছরের শুরুতে আনুষ্ঠানিকভাবে বোর্ড অব পিস গঠন করা হয়। পরিকল্পনাটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সমর্থন পেয়েছে। বোর্ডটির লক্ষ্য হলো হামাসের শাসনের অবসানের পর একটি নতুন অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থায় রূপান্তর সহজ করা এবং একই সঙ্গে বেসামরিক প্রশাসন ও মৌলিক জনসেবাগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা।
তবে গাজায় কর্মরত কূটনীতিক ও এনজিও কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, বেসামরিক জনগণকে প্রবেশাধিকার-নিয়ন্ত্রিত নির্দিষ্ট এলাকায় একত্রিত করা কার্যত জনগণকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার শামিল হতে পারে। পাশাপাশি এটি ফিলিস্তিনিদের অবাধ চলাচলের স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক মানবিক কার্যক্রমের নিরপেক্ষতার নীতিকেও ক্ষুণ্ন করতে পারে।