এডওয়ার্ড স্নোডেন, চেলসি ম্যানিং, জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ, পানামা পেপারস ফাঁসকারী পক্ষসহ দুনিয়াজুড়ে যখন বিভিন্ন খাতের হুইসেলব্লোয়ারদের নাম উল্লেখ করা হয়, তখন একজনের নাম প্রায়ই অনুচ্চারিত থেকে যায়। তিনি মর্দেকাই ভানুনু। ১৯৮৬ সালে তিনিই ব্রিটেনে বসে ইসরায়েলের দিমোনা পরমাণু কর্মসূচির কথা ফাঁস করে দেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সানডে টাইমসের কাছে তিনি এই তথ্য ফাঁস করেন।
সাক্ষাৎকার দেওয়ার পর তিনি লন্ডনে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরছিলেন। কারণ, প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হই হই করেও হচ্ছিল না। তিনি যখন ক্রমশ হতাশ হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তাঁকে ‘সিন্ডি’ নামে এক নারী মোসাদের পক্ষে ফাঁদে ফেলে। তাঁরা একসঙ্গে ইতালিতে যান এবং সেখান থেকেই তাঁকে অপহরণ করা হয়। অপহরণের পর তাঁকে ড্রাগস দেওয়া হয় এবং গোপনে ইসরায়েলে নিয়ে যাওয়া হয়।
ইসরায়েলের গোপন পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির তথ্য প্রকাশ করায় তাঁকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর এক দশকেরও বেশি সময় কাটে নির্জন কারাবাসে। যদিও ২০০৪ সালে মুক্তি পান, কিন্তু বিদেশিদের সঙ্গে কথা বলার জন্য সরকারি অনুমতি ছাড়া তাকে বাধা দেওয়া হয় এবং দেশ ত্যাগেরও অনুমতি দেওয়া হয়নি। কিন্তু মুক্তির শর্তে বলা হয়, তিনি কোনো ক্লাসিফায়েড তথ্য প্রকাশ করতে পারবেন না, এমনকি তা আগে প্রকাশিত হোক বা না হোক।
ইসরায়েল কখনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কথা স্বীকার করেনি। পরিবর্তে তারা ‘নিউক্লিয়ার অপাসিটি বা পারমাণবিক অস্পষ্টতা’ নীতি বজায় রেখেছে, সঙ্গে শপথ করেছে মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র প্রথম ব্যবহার করবে না। প্রতিবেদনে বলা হয়, তাদের অন্তত ৮০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে।
মর্দেকাই ভানুনু ইসরায়েলের নেগেভ পরমাণু প্রকল্পে নিউক্লিয়ার টেকনিশিয়ান হিসেবে কাক করেছেন। বিশ্বের সামনে ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির তথ্য প্রকাশ করায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে অসীম মূল্য চুকিয়েছেন। ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়ার পরও একাধিকবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ভানুনু মরক্কোতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৬৩ সালে পরিবারসহ ইসরায়েলে চলে আসেন। তিনি ১৯৭১ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিন বছর ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীতে কাজ করেন এবং ফার্স্ট সার্জেন্ট হিসেবে স্যাপার্স ইউনিট থেকে ‘সম্মানজনক অব্যাহতি’ পান। ১৯৭৬ সালে ভানুনু দিমোনা পরমাণু কেন্দ্রের টেকনিশিয়ান হিসেবে নিয়োগ পান ও বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৭৯ সালের অক্টোবর মাসে তিনি বেন গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন ও ভূগোলের পড়াশোনা শুরু করেন এবং ১৯৮৪–৮৫ সালে স্নাতক হন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই ভানুনু রাজনৈতিকভাবে ক্রমশ সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ইসরায়েলে ফিলিস্তিনিদের সমানাধিকার ও স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ফিলিস্তিনিদের অন্তর্ভুক্তি দাবি করেন। ইসরায়েলের সামরিক অবস্থানের প্রতি ক্রমশ হতাশ হয়ে, তিনি ১৯৮২ সালের লেবানন আক্রমণের বিরোধিতা করেন।
১৯৮৫ সালের নভেম্বর মাসে ভানুনু দিমোনার কর্মী ছাঁটাইয়ের সময় চাকরি হারান। ১০ মাস পরে তিনি লন্ডনভিত্তিক সানডে টাইমসকে দিমোনা কেন্দ্রের তথ্য ফাঁস করেন। তিনি বলেন, ইসরায়েলের পারমাণবিক ক্ষমতা সন্দেহের চেয়ে অনেক বেশি। তিনি সংবাদপত্রকে জানান, ইসরায়েলের কাছে সম্ভবত ১০০–২০০টি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, তারা পারমাণবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী থার্মোনিউক্লিয়ার ডিভাইস তৈরি করতে সক্ষম এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে নিয়মিত পারমাণবিক ইস্যুতে সহযোগিতা করেছে।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক দিন পর ভানুনু নিখোঁজ হন। পরে জানা যায়, তাঁকে লন্ডন থেকে রোমে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা ফাঁদে ফেলে অপহরণ করেছে এবং গোপনে ইসরায়েলে নেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি ও দেশদ্রোহিতার অভিযোগে মামলা শুরু হয়। ১৯৮৭ সালের আগস্টে গোপন বিচার শুরু হয় এবং পরের বছর মার্চে তাকে ১৯ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালের শেষে, ভানুনুর ৪২ তম জন্মদিনের ঠিক পর, তিনি প্রায় ১০ বছর—তার জীবনের প্রায় এক চতুর্থাংশ—নির্জন কারাবাসে কাটান। তার কারাগারের মাত্র ৩ মিটার বাই ২ মিটার দৈর্ঘ্য–প্রস্থের।
সানডে টাইমস ভানুনুর প্রকাশিত তথ্য যাচাই করেছিল এবং তা এখনো চ্যালেঞ্জ করা হয়নি ইসরায়েলের তরফ থেকে। ১৯৯০-এর দশকের মধ্যভাগে বিশ্বব্যাপী ভানুনুকে মুক্ত করার প্রচারণা শুরু হয়। কিন্তু তাতেও খুব একটা কাজ হয়নি। অনেক পরে, তাঁকে ২০০৪ সালে মুক্তি দেওয়া হয় কঠোর শর্তে।