বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটের প্রাথমিক কাঠামো ও ভিত্তিমূলক ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রিয়ার অ্যাডমিরাল আবদুল্লাহ বিন সালেম আল–শেহরিকে জোটটির কমান্ডার হিসেবে নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। সদ্য প্রতিষ্ঠিত এই সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের লক্ষ্য হলো লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব প্রণালি এবং এডেন উপসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করা। এই জোটে বাংলাদেশও আছে।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম আশারক আল-আওসাতের খবরে বলা হয়েছে, আলশেহরির সামরিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ৩২ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। রয়্যাল সৌদি নেভাল ফোর্সেসে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড ও অপারেশনাল পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর পূর্ববর্তী দায়িত্বগুলোর মধ্যে ছিল—রয়্যাল সৌদি নেভাল ফোর্সেসের পরিকল্পনা, বাজেট ও বাহিনী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন, স্পেনে নেভাল সুপারভিশন অ্যান্ড ফলো-আপ অফিসের নেতৃত্ব দেওয়া এবং ‘সারাওয়াত প্রকল্পের’ তদারকি করা। সারাওয়াত প্রকল্পের আওতায় রয়্যাল সৌদি নেভাল ফোর্সেসের জন্য পাঁচটি যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করা হয়।
তিন দশকেরও বেশি সময়ের সামরিক ক্যারিয়ারে আলশেহরি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং বহুজাতিক সামরিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। জোটে আরও কয়েকটি দেশ সদস্যপদ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করায়, এই অভিজ্ঞতা জোটটির নেতৃত্ব দিতে তাঁকে বিশেষভাবে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আলশেহরি সৌদি আরব ও স্পেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সম্পাদিত নির্বাহী চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য গঠিত স্টিয়ারিং কমিটির সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি, তিনি বহু যৌথ নৌ-অভিযান, মিশন ও সামরিক মহড়ার পরিকল্পনা ও কমান্ডে অংশ নিয়েছেন। কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, অপারেশনাল পরিকল্পনা এবং বহুজাতিক সামরিক সহযোগিতায় তার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে।
আলশেহরি মাদ্রিদের কমপ্লুতেন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিরক্ষা নীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্কুল থেকে মানবসম্পদ ব্যবস্থা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আরেকটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে তাঁর। তিনি যুক্তরাজ্যে ‘হায়ার স্ট্র্যাটেজিক লিডারশিপ’ বিষয়ে উন্নত নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ, স্পেনের ন্যাশনাল ডিফেন্স স্টাডিজ সেন্টারে কমান্ড ও স্টাফ বিষয়ক উচ্চতর শিক্ষা এবং ফ্রান্সে উন্নত অপারেশন প্রশিক্ষণও সম্পন্ন করেছেন।
দীর্ঘ সামরিক জীবনে আলশেহরি অসংখ্য সম্মাননা, সামরিক ব্যাজ ও পদকে ভূষিত হয়েছেন।
এর আগে, গত ৩০ জুলাই লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং এডেন উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক নৌ-সামরিক জোট গঠনের ঘোষণা দেয় সৌদি আরবসহ ১৪টি দেশ। এই জোটে আছে বাংলাদেশও।
এক বিবৃতিতে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, সম্মিলিত সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যেই গড়ে তোলা হয়েছে ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’। জোটভুক্ত দেশগুলো স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ভারত মহাসাগরের সঙ্গে ভূমধ্যসাগরকে যুক্ত করা এই অতি গুরুত্বপূর্ণ তিনটি জলপথে তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের রুট পুরোপুরি নিরাপদ রাখতে চায়।
এই জোট গঠনের আলোচনায় অংশ নিতে ৫১টি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যার মধ্যে সাড়া দিয়ে বৈঠকে হাজির হয়েছিল ৪৩টি দেশের প্রতিনিধিরা। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, আলোচনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি প্রতিনিধিদলও উপস্থিত ছিল। যদিও লোহিত সাগরে আগে থেকেই ইইউর ‘অ্যাস্পাইডস’ নামে একটি নিজস্ব নৌ নিরাপত্তা মিশন চালু রয়েছে; ফলে সৌদি-নেতৃত্বাধীন এই নতুন জোটের কার্যক্রম তাদের চেয়ে কতটা আলাদা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সৌদি আরব ছাড়া এই জোটে স্বাক্ষরকারী বাকি ১৩টি দেশ হলো—তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, ইয়েমেন, সুদান এবং কমোরোস। তবে একটি বিষয় বেশ চোখ টানে—ইরানকে কেন্দ্র করে বাড়তে থাকা নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যেও সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা ওমানের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো এই চুক্তিতে সই করেনি।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রয়োজনীয় জাতীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অন্য দেশগুলোর জন্যও এই জোটের সনদে যুক্ত হওয়ার পথ খোলা রাখা হয়েছে।’ বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, সদস্য দেশগুলোর দৃঢ় বিশ্বাস—সামুদ্রিক নিরাপত্তা কোনো একক দেশের বিষয় নয়, এটা যৌথ দায়িত্ব। আন্তসীমান্ত নৌ হুমকি মোকাবিলায় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ই প্রধান মূলধন।
কোন দেশ ঠিক কতগুলো যুদ্ধজাহাজ বা বিমান পাঠাবে, সে তথ্য এখনই প্রকাশ করা হয়নি। তবে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ সামরিক মহড়া এবং একযোগে নৌ অভিযান পরিচালনার বিষয়টি এই জোটের মূল কার্যপরিধির মধ্যে থাকছে। জোটের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগ পুরোটাই আত্মরক্ষামূলক এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে গঠিত হয়নি।
এই জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সৌদি আরব, এবং তাদের ভূখণ্ডেই বসছে এই জোটের প্রধান কার্যালয়—যদিও ঠিক কোন শহরে হেডকোয়ার্টার হচ্ছে, তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। গত সপ্তাহেই ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের ওপর একধরনের সামুদ্রিক অবরোধের ঘোষণা দেয়, যার ফলে লোহিত সাগরে ঘুরিয়ে দেওয়া সৌদি তেলবাহী জাহাজগুলোর চলাচল মারাত্মক বিঘ্নিত হয়।