ইরানের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভিডিও প্রকাশ করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। গত সপ্তাহে দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরে ঘটা এই হামলায় অন্তত ১৭৫ জন শিক্ষার্থী ও এক স্টাফ নিহত হন। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, একটি মার্কিন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি স্কুল চত্বরের ভেতরের ভবনে আঘাত হানছে।
ইরানি সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ প্রকাশিত সাত সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যায়, একটি ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুতগতিতে এসে স্কুল চত্বরের দেয়ালঘেরা সীমানার ভেতরের ভবনে আছড়ে পড়ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভবনটি একটি ক্লিনিক ছিল।
ভিডিওর দৃশ্য অনুযায়ী, বালিকা বিদ্যালয়টি আক্রান্ত হওয়ার কিছু সময় পরই এই দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্রটি আঘাত হানে, কারণ ভিডিওতে আগে থেকেই চত্বরের অন্য অংশ থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, এই হামলায় নিহতের সংখ্যা ১৬৫ থেকে ১৮০ জন, যাদের বড় একটি অংশই স্কুলছাত্রী (বেশির ভাগই সাত থেকে বারো বছর বয়সী)।
ভিডিওর মান খুব উন্নত না হলেও মিডলবেরি ইনস্টিটিউট অব গ্লোবাল সিকিউরিটির অধ্যাপক জেফরি লুইস জানিয়েছেন, ক্ষেপণাস্ত্রটি দেখতে মার্কিন ‘টমাহক’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো। আর এই টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র কেবল যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই রয়েছে।
গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন স্বীকার করেছিলেন, মার্কিন নৌবাহিনী ওই অঞ্চলে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
তবে শনিবার এয়ারফোর্স ওয়ানে বসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলার দায় সরাসরি ইরানের ওপর চাপান। তিনি বলেন, ‘আমি যা দেখেছি, তাতে মনে হচ্ছে এটি ইরান নিজেই করেছে। কারণ আপনারা জানেন, তাদের অস্ত্রগুলোর গতিপ্রকৃতি নির্দিষ্ট নয়। এটি ইরানের কাজ।’ তবে অধ্যাপক জেফরি লুইস জানিয়েছেন, ভিডিওতে দেখা যাওয়া ক্ষেপণাস্ত্রটি ইরানের তৈরি কোনো ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের নকশার সঙ্গে মেলে না।
মার্কিন গণমাধ্যম এনপিআর ভিডিওটির ভৌগোলিক অবস্থান নিশ্চিত করেছে। ভিডিওটি চত্বরের উল্টো পাশে নির্মাণাধীন একটি আবাসন প্রকল্প থেকে ধারণ করা হয়েছে। অনলাইন গবেষণা সংস্থা বেলিংক্যাট প্রথম ভিডিওটির অবস্থান শনাক্ত করে। আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি এআই ভিডিওগুলোতে সাধারণত সুনির্দিষ্ট জায়গার এত নিখুঁত বিবরণ থাকে না, যা এই ভিডিওর সত্যতাকে জোরালো করেছে।
এ ছাড়া প্ল্যানেট কোম্পানির স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে এনপিআর জানিয়েছে, এই চত্বরটি একসময় ইরানি বিপ্লবী গার্ডের একটি নৌ-ঘাঁটি ছিল। তবে স্থানীয় কর্মকর্তাদের দাবি, গত এক দশক ধরে ঘাঁটিটি পরিত্যক্ত ছিল। স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে চত্বরের একটি অংশ প্রাচীর দিয়ে আলাদা করে বালিকা বিদ্যালয় তৈরি করা হয়। এ ছাড়া ২০২৪ সালে চত্বরের রানওয়ে বা বিমান ওঠানামার পথটি সরিয়ে সেখানে আবাসন প্রকল্প শুরু করা হয়।
তাহলে কি ভুল তথ্যের বলি শিক্ষার্থীরা
২০২৫ সালে ওই চত্বরে একটি ক্লিনিক উদ্বোধন করেছিলেন আইআরজিসি প্রধান হোসেন সালামি (যিনি পরে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন)। অধ্যাপক লুইস মনে করেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী সম্ভবত তাদের সেকেলে বা পুরোনো গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হামলা চালিয়েছে, যেখানে স্থাপনাটি কেবল একটি সামরিক ঘাঁটি হিসেবেই চিহ্নিত ছিল।
পেন্টাগন এই ভিডিওর বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, তাঁরা ঘটনাটি তদন্ত করছেন। তদন্ত চললেও হেগসেথ দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র নয়, ইরানই বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা চালায়।