গাজায় নিখোঁজ হওয়ার প্রায় দেড় বছর পর জীবিত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া গেল ২৫ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি যুবক ঈদ নাঈল আবু শারকে। এত দিন তাঁর পরিবার মনে করেছিল, তিনি মারা গেছেন। মরদেহ খুঁজতে গাজার বিভিন্ন হাসপাতাল ও মর্গে ছুটে বেড়িয়েছেন স্বজনেরা। এমনকি শোকপালনের জন্য তাঁবুও খাটানো হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ এক আইনজীবীর ফোনে জানা যায়, ঈদ জীবিত আছেন এবং বর্তমানে ইসরায়েলের ওফার কারাগারে আটক রয়েছেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর কাজের সন্ধানে গাজার কেন্দ্রীয় অঞ্চলের নেটজারিম করিডরের কাছে গিয়ে নিখোঁজ হন ঈদ। এলাকাটি ‘অ্যাক্সিস অব ডেথ’ বা ‘মৃত্যুর কেন্দ্র’ নামেও পরিচিত। এখানে বহু ফিলিস্তিনি নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। ঈদের বাবা নাঈল আবু শার জানান, ছেলেকে খুঁজতে গিয়ে তিনি প্রতিদিন মর্গ ও হাসপাতালের দরজায় ঘুরেছেন। আল-আকসা, আল-আওদা ও নুসেইরাত হাসপাতালের মর্গ পর্যন্ত খুঁজেছেন, কিন্তু কোনো সন্ধান পাননি।
এ অবস্থায় ঈদের পরিবার আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের সহায়তাও চেয়েছিল। কিন্তু কোথাও ঈদের আটক থাকার কোনো নথি পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে পরিবার তাঁকে মৃত ধরে নেয় এবং গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকেও মৃত্যু সনদ সংগ্রহ করে।
তবে ঈদের মা মাহা আবু শার কখনো আশা হারাননি। তিনি বলেন, ‘সবাই আমাকে গায়েবানা জানাজা পড়তে বলেছিল। কিন্তু আমার মন বলত ঈদ বেঁচে আছে।’ এক মাস আগে মুক্তি পাওয়া এক বন্দি কারাগারে ঈদ নামের একজনকে দেখেছেন বলে জানান। পরে গত ৪ মে এক আইনজীবী বিষয়টি নিশ্চিত করলে আনন্দে ভরে ওঠে পুরো পরিবার। শোকের বাড়ি মুহূর্তেই উৎসবে পরিণত হয়, প্রতিবেশীদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করা হয়।
তবে এই ঘটনা গাজার হাজারো পরিবারের অনিশ্চয়তার চিত্রও সামনে এনেছে। ফিলিস্তিনি সেন্টার ফর দ্য মিসিং অ্যান্ড ফোর্সিবলি ডিসঅ্যাপিয়ার্ডের পরিচালক নাদা নাবিলের মতে, বর্তমানে ৭ থেকে ৮ হাজার ফিলিস্তিনি নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন ইসরায়েলের কারাগারে গুম অবস্থায় থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নাবিলের অভিযোগ, আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য গোপন রাখা ইসরায়েলের একটি পরিকল্পিত কৌশল, যা পরিবারগুলোর মানসিক যন্ত্রণা আরও বাড়িয়ে দেয়। অনেক পরিবার জানেই না, তাঁদের স্বজন ধ্বংসস্তূপের নিচে, গণকবরে নাকি কারাগারে আছেন। এই অনিশ্চয়তাকে মনোবিজ্ঞানীরা ‘সাসপেন্ডেড গ্রিফ’ বা ‘স্থগিত শোক’ বলে অভিহিত করেন।
ছেলের সন্ধান পেলেও ঈদের মা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আমি খুশি যে সে বেঁচে আছে। কিন্তু এখন আরও ভয় হচ্ছে—ওই কারাগারের ভেতরে সে কী সহ্য করছে। আমি তখনই সত্যিকারের শান্তি পাব, যখন তাকে আবার নিজের বুকে জড়িয়ে ধরতে পারব।’