নির্বাচনে পরাজয়ের পর ব্রাজিল ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নিজেকে দেশটির ‘বৈধ নেতা’ দাবি করেছেন সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে পৌঁছে তিনি অভিযোগ করেন, সুপ্রিম কোর্ট ও প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা মিলে নির্বাচনে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাঁকে ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করেছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, নির্বাচনে লুলা ৪৫ লাখের মতো ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। ব্রাজিলের নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, বিশ্বনেতা এবং ফ্লাভিওর নিজস্ব রাজনৈতিক দলও লুলার বিজয়কে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে পাসপোর্ট জমা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর গোপনে দেশ ছাড়েন ফ্লাভিও। অর্থ পাচারের একটি তদন্তের সঙ্গে ওই নির্দেশের সম্পর্ক রয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ায় আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইকে ধন্যবাদ জানান ফ্লাভিও। একই সঙ্গে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা দিয়ে স্বাগত জানানোর জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক খোলা চিঠিতে প্রথমে নিজেকে ‘নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট’ ঘোষণা করেন ফ্লাভিও। পরে ওই চিঠি মুছে দিয়ে সংশোধিত আরেকটি চিঠি প্রকাশ করেন তিনি। সেখানে নিজেকে ব্রাজিলের বৈধ ‘নেতা’ বলে দাবি করেন।
সংশোধিত চিঠিতে ফ্লাভিও বলেন, ‘আমি শুধু আমার ৬ কোটি ভোটারকেই নয়, ব্রাজিলের জনগণকেও বলতে চাই, আমিই নেতা। আর যারা ব্রাজিলের নির্বাচন চুরি করেছে, সেই অপরাধীরা একটি অপরাধী সংগঠনের অংশ, যারা দেশে স্বৈরাচারী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে।’ তবে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি ফ্লাভিও। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ফল বাতিলের জন্য তাঁর আবেদন সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
ব্রাজিলের নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের প্রধান কাসিও নুনেস মার্কেস এক বিবৃতিতে বলেন, দেশটির নির্বাচন সম্পূর্ণ আইন ও সাংবিধানিক বিধিবিধান মেনেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে তিনি ফ্লাভিওর চিঠি সম্পর্কে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে সাংবাদিকেরা ফ্লাভিওর বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রাম্প মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে এর আগে দেওয়া বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে তিনি নির্বাচনটিকে ‘খুবই অদ্ভুত’ বলে উল্লেখ করেন।
ফ্লাভিওর এই ঘোষণা লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলের সঙ্গে সম্পর্ক সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের জন্য নতুন জটিলতা তৈরি করেছে। ব্রাজিলে রয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরল মৃত্তিকা খনিজের মজুত। লুলার অভিযোগ, বলসোনারো পরিবারকে আবারও ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করছে। রোববারের নির্বাচনের আগে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বলসোনারো পরিবারকে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর একটি প্রচারাভিযান চালাচ্ছে। তবে ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেছে ওয়াশিংটন।
এর আগে ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, ফ্লাভিওর বাবা ও ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো বিচারিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।
২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর যুক্তরাষ্ট্রে চলে গিয়েছিলেন জইর বলসোনারো। পরে ব্রাজিলে ফিরে আসেন তিনি। রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় তাঁর সমর্থকেরা সরকারি ভবনগুলোতে হামলা চালানোর পর অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের দায়ে তাঁকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। লুলার কার্যালয় ও সুপ্রিম কোর্টও মন্তব্য চেয়ে পাঠানো অনুরোধের তাৎক্ষণিক জবাব দেয়নি। দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে কারাভোগ করেছিলেন লুলা। তবে পরে তাঁর সেই দণ্ড বাতিল করা হয়। এ সপ্তাহে তিনি বলেন, নিজের নির্দোষিতা প্রমাণের জন্য ব্রাজিলে অবস্থান না করে বলসোনারোর দেশ ছেড়ে যাওয়া ‘লজ্জাজনক’।
নিজের চিঠিতে ব্রাজিল থেকে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন ফ্লাভিও। তাঁর দাবি, নিজেকে ও নিজের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে এবং লুলা ও ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টের কথিত রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়া এড়াতেই তিনি দেশ ছেড়েছেন। ফ্লাভিও বলেন, ‘আমি বিষয়টি স্পষ্ট করে দিতে চাই: আমি ব্রাজিল থেকে পালিয়ে যাইনি। আমি ব্রাজিল ছেড়েছি, কিন্তু ব্রাজিলের জনগণকে পরিত্যাগ করিনি।’