ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা এক শতাব্দীর ইতিহাসের সবচেয়ে বিধ্বংসী জোড়া ভূমিকম্পের পর দেশজুড়ে চরম হাহাকার ও ধ্বংসস্তূপের চিত্র ফুটে উঠেছে। তবে দুর্যোগের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, সম্ভাব্য নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার থেকে ১ লাখ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এ বিষয়ে ইউএসজিএস রেড অ্যালার্ট বা লাল সতর্কতা জারি করেছে। এখন প্রশ্ন হলো—মাঠপর্যায়ের তথ্য ছাড়াই এত দ্রুত কীভাবে এই ভয়াবহ প্রাণহানির হিসাব করা সম্ভব হলো। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মাঠের উদ্ধারকারীদের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা না করে ইউএসজিএস মূলত ‘প্যাজার’ (PAGER) বা ‘প্রম্পট অ্যাসেসমেন্ট অব গ্লোবাল আর্থকোয়েক রেসপন্স’ নামক একটি অত্যন্ত উন্নত গাণিতিক ও কম্পিউটারাইজড মডেলিং ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে এই তাৎক্ষণিক পূর্বাভাস দিয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান ডিয়েগোর প্রখ্যাত ভূপদার্থবিদ বাশান রাইট এই হিসাব প্রক্রিয়ার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, প্যাজার কোনো কাল্পনিক অনুমান নয়, বরং সেকেন্ডের মধ্যে হাজার হাজার ডেটা বিশ্লেষণ করার একটি স্বয়ংক্রিয় বৈজ্ঞানিক টুল। ভূমিকম্পের সংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই মডেলটি রিখটার স্কেলে কম্পনের তীব্রতা ও ভূগর্ভের গভীরতা পরিমাপ করে।
বাশান রাইট আরও জানান, এরপর স্যাটেলাইট ডেটার মাধ্যমে তৈরি বৈশ্বিক জনসংখ্যার মানচিত্র থেকে উৎপত্তিস্থলের চারপাশের জনসংখ্যার ঘনত্ব মিলিয়ে নেয়। একই সঙ্গে ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভবনের ধরন ও দুর্বলতার তালিকা এবং অতীতে হওয়া সমমাত্রার ঐতিহাসিক ভূমিকম্পের পরিসংখ্যানগত ডেটা বিশ্লেষণ করে একটি নিখুঁত গাণিতিক সমীকরণ তৈরি করে। আর অধিকাংশ সময়ই প্যাজারের এই পূর্বাভাসটি পরবর্তী সময়ে প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যার খুব কাছাকাছি প্রমাণিত হয়।
এই বিজ্ঞানী আরও জানান, ভয়াবহ এই জোড়া কম্পনের তীব্রতা প্রায় ১০ কোটি টন টিএনটি বারুদ বিস্ফোরণের সমতুল্য ছিল এবং এর পর থেকে ইতিমধ্যে ২০টিরও বেশি আফটারশক বা পরবর্তী মৃদু কম্পন রেকর্ড করা হয়েছে। এরই মধ্যে বিজ্ঞানীরা দেশটিতে নতুন করে শক্তিশালী পরবর্তী কম্পন আঘাত হানার তীব্র আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁরা সতর্ক করেছেন, প্রথম ধাক্কায় লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া রাজধানী কারাকাসসহ ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোতে আগামী এক সপ্তাহজুড়ে রিখটার স্কেলে ৫ মাত্রা পর্যন্ত শক্তিশালী কম্পন পুনরায় আঘাত হানতে পারে, যার আশঙ্কা ৯০ শতাংশেরও বেশি।
বিজ্ঞানীরা কারাকাসের অনন্য ভৌগোলিক ট্র্যাজেডিকে এর জন্য দায়ী করছেন। কারণ, কারাকাস শহরটি মূলত একটি গভীর পলল অববাহিকার ওপর অবস্থিত। এই নরম পলিমাটি ভূগর্ভের কম্পন তরঙ্গকে প্রবর্ধিত করে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, ফলে যেকোনো মৃদু পরবর্তী কম্পনও সেখানে মারাত্মক রূপ নিতে পারে।
এদিকে আকস্মিক এই বিপর্যয়ের পর দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন বা ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ। প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং ধসে পড়া বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা সচল করতে কাজ চলছে।
রাজধানীর অভিজাত আলতামিরা এলাকায় একটি ২২ তলা আবাসিক ভবন সম্পূর্ণ ধসে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, যেখান থেকে মানুষকে উদ্ধারে উদ্ধারকর্মীরা মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে বিজ্ঞানীদের দেওয়া আগামী সপ্তাহের সম্ভাব্য প্রবল আফটারশকের পূর্বাভাস এই উদ্ধারকাজকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ ও ধীরগতির করে তুলেছে।