ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করে ট্রাম্প প্রশাসনকে সহযোগিতা করবেন কি না—তা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। এই প্রতিবেদন সম্পর্কে অবগত চারজন ব্যক্তি সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ কথা জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জনসমক্ষে বলেছেন, তাঁরা চান প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ ইরান, চীন ও রাশিয়ার মতো ঘনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন এবং ভেনেজুয়েলা থেকে তাদের কূটনীতিক ও উপদেষ্টাদের বহিষ্কার করবেন।
তবে চলতি মাসের শুরুতে রদ্রিগেজের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ওই দেশগুলোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকলেও তিনি এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো পদক্ষেপের ঘোষণা দেননি।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার পর রদ্রিগেজ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন।
ওই চার সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রদ্রিগেজ তাঁর দেশে মার্কিন কৌশলের সঙ্গে পুরোপুরি একমত কি না, তা স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) পরিচালক জন র্যাটক্লিফ ১৫ জানুয়ারি কারাকাস সফর করেন এবং সেখানে তিনি রদ্রিগেজের সঙ্গে দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন। তবে সেই আলোচনার পর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স।
ওয়াশিংটন পশ্চিম গোলার্ধে, বিশেষ করে ভেনেজুয়েলায় তাদের শত্রুদের প্রভাব কমিয়ে আনতে চাইছে। পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদ কাজে লাগানোর সুযোগ খুঁজছে।
রয়টার্স বলছে, রদ্রিগেজ যদি মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন, তাহলে ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাতে মার্কিন বিনিয়োগের বড় সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু রদ্রিগেজকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে তা ওয়াশিংটনের দূর থেকে দেশটিকে পরিচালনা করার এবং বড় ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ এড়ানোর প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
এ বিষয়ে সিআইএ ও ভেনেজুয়েলা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার নেতাদের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ বজায় রাখছেন এবং এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছেন।
কিছুদিন আগেও সিআইএর মূল্যায়ন ছিল, মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রদ্রিগেজসহ মাদুরোপন্থী কর্মকর্তারা ভেনেজুয়েলা পরিচালনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত অবস্থানে আছেন।
তবে ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা কৌশলের সমালোচকেরা মাদুরোর অনুগতদের অন্তর্বর্তী নেতা হিসেবে রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। দুজন সূত্র জানান, লাতিন আমেরিকার দেশটিতে মার্কিন সামরিক অভিযানের আগেই রদ্রিগেজের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ ছিল।
ভেনেজুয়েলার আন্তর্জাতিক মিত্রদের মধ্যে ইরান দেশটির তেল শোধনাগার মেরামতে সহায়তা করেছে, চীন ঋণের বদলে তেল নিয়েছে আর রাশিয়া সামরিক বাহিনীকে ক্ষেপণাস্ত্রসহ বিভিন্ন অস্ত্র সরবরাহ করেছে।
ট্রাম্প কিউবাকেও ‘মার্কিন শত্রু’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি চান, ভেনেজুয়েলা তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করুক। কিউবা ভেনেজুয়েলাকে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহায়তা দেয়; বিনিময়ে সস্তায় তেল পায়।
মাদুরোকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে অপসারণের পর রদ্রিগেজ ওয়াশিংটনের সুনজরে থাকার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেন। তিনি মাদুরোর কড়া সমালোচক রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বিক্রির অনুমতি দেন।
তবে গত রোববার এক বক্তব্যে রদ্রিগেজ জানান, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হস্তক্ষেপের বিষয়ে তিনি ‘বিরক্ত’।
এরপরও মার্কিন কর্মকর্তারা সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনা করেছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। দুটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন যেহেতু রদ্রিগেজকে জনসমক্ষে জোরালোভাবে সমর্থন দিয়েছে, তাই এই মুহূর্তে তাঁর সঙ্গে কাজ করা ছাড়া তাদের কাছে তাৎক্ষণিক কোনো বিকল্প নেই।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ভেনেজুয়েলার উচ্চপদস্থ সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে চলছেন; যাতে প্রয়োজনে তাঁরা তাঁদের কৌশলে পরিবর্তন আনতে পারেন।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো বর্তমানে সফলভাবে দেশ চালাতে সক্ষম নন। এর কারণ হিসেবে সূত্রগুলো জানিয়েছে, দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী বা তেল খাতের সঙ্গে তাঁর শক্তিশালী কোনো যোগাযোগ নেই।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের জানান, তিনি মাচাদোকে ভেনেজুয়েলার নেতৃত্বে ‘যুক্ত’ দেখতে চান। তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।
মাচাদোর সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের আলোচনার বিষয়ে অবগত এক ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, হোয়াইট হাউস তাঁকে বেশ পছন্দ করে এবং ভেনেজুয়েলার দীর্ঘমেয়াদি নেতৃত্বে তাঁকে বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, মাচাদোকে আপাতত ভেনেজুয়েলার উপদেষ্টা পদের জন্য বিবেচনা করা হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
মাচাদোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।