ভারতের তামিলনাড়ুতে সমাজসংস্কারক ও যুক্তিবাদী নেতা ইভি রামাসামি পেরিয়ারের নামে প্রতিষ্ঠিত একটি গ্রন্থাগারে ভুয়া লেখক, অস্তিত্বহীন প্রকাশনা সংস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি নিম্নমানের বই সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে) ও বিরোধী দল দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগামের (ডিএমকে) মধ্যে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ চলছে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) এনডিটিভি জানায়, অনলাইন সাময়িকী সিন্ধাইয়ে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী নিবন্ধে বিশিষ্ট তামিল লেখক পেরুমল মুরুগান গ্রন্থাগারটির বই কেনায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, অখ্যাত ও অস্তিত্বহীন প্রকাশনা সংস্থার কাছ থেকে হাজার হাজার বই অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে কেনা হয়েছে। এসব বইয়ে রয়েছে তথ্যগত ভুল, ব্যাকরণগত ত্রুটি এবং এআই দিয়ে তৈরি বলে সন্দেহ হয় এমন লেখা।
শুক্রবার রাজ্যের স্কুলশিক্ষামন্ত্রী রাজ মোহন জানিয়েছেন, অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যে-ই জড়িত থাকুক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।’
মুরুগানের অভিযোগ, আগল ভিলাক্কু নামের একটি প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি বই কেনা হয়েছে। চার দশক ধরে সাহিত্যজগতের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তিনি আগে কখনো এই প্রকাশকের নাম শোনেননি। বইগুলো গ্রন্থাগারের চতুর্থ তলায় তামিল ভাষার বইয়ের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে। অনেক বইয়ের দাম ১ হাজার ৪০০ রুপি বা তারও বেশি।
তিনি উদাহরণ হিসেবে ‘নালাদিয়ার ভালকাইয়িন ভালকাট্টি’ বইটির কথা উল্লেখ করেন। ৩০০ পৃষ্ঠার বইটির লেখক হিসেবে সূর্য বালুর নাম রয়েছে এবং দাম ১ হাজার ৪৪৫ রুপি। অথচ এতে নালাদিয়ারকে বিখ্যাত তামিল কবি ও দার্শনিক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এটি জৈন সন্ন্যাসীদের রচিত ৪০০টি চতুষ্পদী কবিতার সংকলন।
আরেকটি বইয়ে সংগম যুগের সাহিত্যকর্ম ‘মাদুরাই কাঞ্চি’র লেখক হিসেবে মাদুরাই কুঝাথিপ পেরুভালুথি নামের এক রাজার উল্লেখ রয়েছে। অথচ স্বীকৃত লেখক কবি মাঙ্গুড়ি মারুথানার।
এ ছাড়া ভারতীয় কবি সুব্রামানিয়া ভারতীর নামে অপ্রামাণিক গল্প সংযোজন এবং তামিলনাড়ুর ইতিহাস নিয়ে লেখা বইয়ে রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এম করুণানিধির নাম-পরিচয় ভুলভাবে উপস্থাপনের অভিযোগ উঠেছে।
বইগুলোর লেখক হিসেবে ত্রিশা বিজয়, বিজয় আদিথান, মনিকা সূর্য, মনিকা রবি, জ্যোতি সারাভানান ও মনীষা সারাভানানের মতো নাম পাওয়া গেছে। ফিনিক্স পাবলিশার্স নামের আরেকটি সংস্থা প্রায় ১০০টি বই সরবরাহ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রায় ৩০০ কোটি রুপি ব্যয়ে সাত একর জমির ওপর নির্মিত সাততলা পেরিয়ার আরিভুলাগাম গ্রন্থাগার ও বিজ্ঞানকেন্দ্রটি গত ১৬ অক্টোবর উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী সি জোসেফ বিজয়। আগের ডিএমকে সরকারের আমলে প্রকল্পটির কাজ শুরু হলেও বর্তমান টিভিকে সরকারের আমলে তা সম্পন্ন হয়।
মুরুগান নিজেও আগের ডিএমকে সরকারের গঠিত বই সুপারিশ কমিটির সদস্য ছিলেন। তবে বিতর্কিত বইগুলো ওই কমিটির সুপারিশে কেনা হয়েছিল, নাকি কমিটির অজ্ঞাতে সংগ্রহ করা হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি বইগুলো গ্রন্থাগার থেকে সরিয়ে ক্রয় ও সরবরাহের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
মুখ্যমন্ত্রী বিজয় এ ঘটনায় ডিএমকেকে ‘দুর্নীতির উৎস’ আখ্যা দিয়ে সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে ডিএমকের দাবি, বিতর্কিত বইগুলোতে জুন মাসের তারিখের সিল রয়েছে, অথচ অন্য বইগুলোতে মার্চের সিল। অর্থাৎ সরকার পরিবর্তনের পরও বই কেনা হয়ে থাকতে পারে।
এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অভিনেতা ও রাজ্যসভার সদস্য কমল হাসান। তিনি বলেন, তামিল ভাষার জন্য এর চেয়ে বড় লজ্জা আর হতে পারে না। ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বইগুলো সরিয়ে ফেলা এবং সংশ্লিষ্ট প্রকাশকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এদিকে টিভিকের মিত্র কংগ্রেস নেতা মানিকম ঠাকুর শুধু পেরিয়ার গ্রন্থাগার নয়, ডিএমকে সরকারের আমলে রাজ্যের সব গ্রন্থাগারের জন্য কেনা বইয়ের পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা ও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।