টেলিভিশন স্টুডিওর নির্বাচনী বিশ্লেষণ কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার জমানার অনেক আগে থেকেই বাংলার রাজনীতির পালস্ মাপা হতো ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে আছড়ে পড়া জনস্রোত দিয়ে। সেই ট্র্যাডিশন মেনেই এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তিলোত্তমা কলকাতা। যে ময়দান একসময় বামফ্রন্টের অপরাজেয় শক্তির আস্ফালন দেখেছে, যেখানে ধ্বনিত হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধী গর্জন— সেই মাঠই এখন সাক্ষী হতে চলেছে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এই প্রথমবার কোনো অ-কংগ্রেসি, অ-বাম এবং অ-তৃণমূল দল হিসেবে বিজেপি তাদের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে ব্রিগেডে।
আজ শনিবার সন্ধ্যায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পার্শ্বস্থ এই বিশাল সবুজ প্রান্তর সাক্ষী থাকবে শুভেন্দু অধিকারীর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং বাংলার রাজনৈতিক মেরুকরণের এক চূড়ান্ত প্রতিফলন।
ক্রুশ্চেভ থেকে মোদী
১৯৫০-এর দশক থেকেই ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড ভারতের সমাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক চেতনার এক আন্তর্জাতিক মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছে। ১৯৫৫ সালে সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ ও নিকোলাই বুলগানিন এই ময়দানেই এক অভূতপূর্ব গণসংবর্ধনা পেয়েছিলেন। ২০০৫ সালে ভেনেজুয়েলার বিপ্লবী নেতা হুগো চাভেজ এখান থেকেই বামপন্থার জয়গান গেয়েছিলেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ইন্দিরা গান্ধীর উপস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমান এখানে ভাষণ দিয়েছিলেন, যেখানে ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় হিন্দ’ স্লোগান মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।
১৯৮৪ সালে জ্যোতি বসু, এন টি রামা রাও এবং ফারুক আবদুল্লাদের মতো হেভিওয়েট নেতারা এখান থেকেই কংগ্রেস বিরোধী আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ২০১৯ সালে বিজেপি বিরোধী ‘মহাগঠবন্ধনের’ মহড়া দিয়েছিলেন এই মাঠেই।
একসময় এই মাঠে কেবল লাল ঝান্ডা বা জোড়াফুলের দাপট দেখা যেত, সেখানে আজ এক আদর্শগত পরিবর্তনের ছবি স্পষ্ট। শুক্রবার থেকেই ময়দানজুড়ে সাজ সাজ রব। আবহাওয়া অফিসের বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলেও বিজেপির প্রস্তুতিতে কোনো খামতি নেই।
মাঠজুড়ে তৈরি করা হয়েছে বিশাল বিশাল ‘রেইনপ্রুফ’ বা পানিরোধী হ্যাঙ্গার। আকস্মিক বৃষ্টিতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ যাতে ভিজে না যান, সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে। আয়োজকদের আশা, লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হবে এই খোলা প্রান্তরে।
বিজেপি এই অনুষ্ঠানকে কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং একটি ‘নিখুঁত বাঙালি’ উৎসবে পরিণত করতে চাচ্ছে। ময়দানজুড়ে সাজানো হয়েছে বাঁকুড়ার টেরাকোটা মোটিফ, দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আদলে তৈরি স্থাপনা এবং সুন্দরবনের থিম। অনুষ্ঠানজুড়ে থাকবে ছৌ, বাউল এবং গম্ভীরা গানের সুর।
অনুষ্ঠানস্থলে স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বিশালাকার প্রতিকৃতি বসানো হয়েছে।
সেনাবাহিনীর মালিকানাধীন এই বিশাল ময়দানকে একাধিক নিরাপত্তা সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে। ৪ হাজারের বেশি পুলিশ কর্মী এবং ড্রোন ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি চালানো হচ্ছে। একটি বিশেষ এনক্লোজার তৈরি করা হয়েছে যেখানে উপস্থিত থাকবেন উচ্চপদস্থ বিচারপতি, শিল্পপতি, বিদেশি কূটনীতিক এবং টালিউড ও বলিউডের তারকারা। আমন্ত্রিতদের জন্য থাকছে ঝালমুড়ি, রসগোল্লা এবং সন্দেশের মতো খাবারের স্টল।
কেন রাজভবনের বদলে ব্রিগেড? এই প্রশ্নের উত্তরে এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এনডিটিভিকে জানান, বিজেপি এই শপথ গ্রহণের মাধ্যমে দৃশ্যত এটি বোঝাতে চাচ্ছে যে, বাংলার রাজনীতির ‘সেন্টার অব গ্র্যাভিটি’ বা ক্ষমতার ভরকেন্দ্র এখন সম্পূর্ণ পরিবর্তিত। ব্রিগেড মানেই বাংলার মানুষের সমর্থন— এই বার্তাটিই তারা জাতীয় স্তরে পৌঁছাতে চায়।
ইতিহাসের সাক্ষী এই ময়দানে একদা ব্রিটিশরা কুচকাওয়াজ করত, পরে কমরেডরা ইনকিলাব জিন্দাবাদ ধ্বনি দিত— আজ সেখানে শঙ্খধ্বনি আর ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগানের মাঝে নতুন এক রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা হতে চলেছে।