পশ্চিমবঙ্গে রেলওয়ের উচ্ছেদ অভিযানের মধ্যে আত্মহত্যা করেছেন ৫৯ বছর বয়সী ট্রেন হকার কার্তিক সাউ। গত ২৮ জুন সকালে উত্তর ২৪ পরগনার কাঁকিনাড়ার দুর্গানগর এলাকার এই বাসিন্দা নিজের জীবন শেষ করেন। চলতি বছরের মে মাসের মাঝামাঝি থেকে নতুন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকার রেলস্টেশনগুলোতে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করার পর থেকে রাজ্যের ট্রেন হকারদের মধ্যে যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, কার্তিক সাউয়ের মৃত্যু সেই সংকটকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যারের খবরের বলা হয়েছে, পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন কার্তিক সাউ। রেলপথই ছিল তাঁর জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। শেষ পর্যন্ত সেই রেললাইনেই তিনি আত্মহত্যা করেন।
চলন্ত ট্রেন ও রেলস্টেশনে পণ্য বিক্রি করা হকারদের দাবি, তাঁরা এখন প্রতিনিয়ত জীবিকা হারানোর ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও একই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, রেলওয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন ও পুনর্গঠনের নামে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানে হাজার হাজার অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে।
এই অভিযানের প্রভাব শুধু স্টেশন এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। রেললাইনের ধারে গড়ে ওঠা অস্থায়ী বসতিগুলোও বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব এলাকায় বহু ট্রেন হকার ও নিম্নআয়ের পরিবার বসবাস করত। ফলে অনেক পরিবার একসঙ্গে জীবিকা ও মাথা গোঁজার আশ্রয় হারিয়েছে। আয় ও বাসস্থান দুটিই হারিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেকেই চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে কার্তিক সাউয়ের মৃত্যু রেল হকারদের সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে। তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যু নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, চলন্ত ট্রেনে হকারি করে জীবিকা নির্বাহকারী মানুষদের এভাবেই কি উপার্জনের পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে?
কার্তিক সাউ শিয়ালদহ থেকে ছেড়ে যাওয়া এক্সপ্রেস ট্রেনগুলোতে ঝালমুড়ি বিক্রি করতেন। পশ্চিমবঙ্গে এপ্রিলের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির প্রচারণায় ঝালমুড়ি একটি প্রতীকী খাবারে পরিণত হয়েছিল। নির্বাচনী প্রচারের সময় জঙ্গলমহলের ঝাড়গ্রামে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে রাস্তার পাশের একটি দোকানে ঝালমুড়ি খেতে দেখা যায়। নির্বাচনের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজ হাতে প্রধানমন্ত্রীকে ঝালমুড়ি পরিবেশন করেন। প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফরেও এই খাবারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছিলেন।
বিদ্রূপের বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মতো কার্তিক সাউও একসময় চা বিক্রি করতেন। পরে তিনি ঝালমুড়ি বিক্রি শুরু করেন। প্রায় তিন দশক ধরে প্রতিদিন সকালে স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েদের নিয়ে ভাড়া বাসায় নাশতা করে কাঁকিনাড়া স্টেশনে যেতেন। সেখান থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরের শিয়ালদহ স্টেশনে গিয়ে এক্সপ্রেস ট্রেনে ঝালমুড়ি বিক্রি করতেন।
কার্তিক সাউয়ের সহকর্মী হকারদের ভাষ্য, আগে মাঝে মধ্যে রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্সের (আরপিএফ) সদস্যদের সঙ্গে তাঁদের বাগ্বিতণ্ডা হলেও তা খুব বেশি হতো না। তবে শিয়ালদহ-বনগাঁ লোকাল ট্রেনে আমলকী বিক্রি করা সাজল কিরনানিয়া এবং ঠান্ডা পানির বোতল বিক্রি করা দুলাল নাগের দাবি, উচ্ছেদ অভিযান শুরু হওয়ার পর আরপিএফের আচরণ আরও কঠোর হয়েছে।
সাজল কিরনানিয়া নামে আরেক হকার বলেন, ‘রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর স্টেশন চত্বর পরিষ্কার ও সৌন্দর্যায়নের নামে ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। বুলডোজার দিয়ে নির্বিচারে হকারদের উচ্ছেদ করা হয় এবং শিয়ালদহ স্টেশনকে হকারমুক্ত এলাকা ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সেখানেই বিষয়টি থেমে থাকেনি। চলন্ত ট্রেনের ভেতরে খাবার ও অন্যান্য ছোটখাটো পণ্য বিক্রি করে যাঁরা জীবিকা নির্বাহ করতেন, তাঁরাও এখন লাগাতার হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আরপিএফ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কোনো হকারকেই আর ট্রেনের বগিতে উঠে কিছু বিক্রি করতে দেওয়া হবে না।’