প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক সময় বলেছিলেন—‘না খায়েঙ্গে, না খানে দেঙ্গে’ মানে দুর্নীতি করব না, করতেও দেব না। কিন্তু সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতায় মোদির এই বহুলপ্রচলিত স্লোগান যেন ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর রাজনীতির আড়ালে চাপা পড়ে গেছে। এক সময় ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) যে বিরোধী নেতাদের লুটেরা বা দুর্নীতিবাজ বলে আক্রমণ করেছিল (নারদ স্টিং অপারেশন থেকে শুরু করে লুই বার্জার ঘুষ কেলেঙ্কারি) আজ সেই নেতারাই দলবদল করে গেরুয়া শিবিরের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়েছেন।
বিরোধীদের অভিযোগ, মোদি জমানায় বিজেপি দুর্নীতি বন্ধ করার চেয়ে দলছুট দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের নিজেদের ছত্রছায়ায় আশ্রয় দিয়ে পবিত্র করার এক অভিনব নীতি গ্রহণ করেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী এবং আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার মতো হেভিওয়েট নেতাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার শীর্ষে বসিয়ে বিজেপি এটাই প্রমাণ করছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের লড়াইয়ের চেয়েও রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণ মেলানো ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দ্য ওয়্যারের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মোদি জমানায় যেকোনো প্রভাবশালী বিরোধী নেতাকে নিজেদের দলে ভেড়াতে এবং শীর্ষ পদে বসাতে বিজেপি সুনির্দিষ্ট একটি ফর্মুলা বা ‘ফোর আই’ (4 I) প্যাটার্ন অনুসরণ করে থাকে।
এর মধ্যে প্রথমেই আছে আইডেনটিফাই/Identify বা শনাক্তকরণ)। কোনো বিরোধী হেভিওয়েট নেতাকে কোটি রুপির দুর্নীতির মামলায় চিহ্নিত করা এবং তা জনসমক্ষে প্রচার করা।
এরপরই শুরু হয় ইনভেস্টিগেশন/Investigation বা তদন্ত। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা—যেমন এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) বা সিবিআই (সিবিআই) ব্যবহার করে ওই নেতার ওপর আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা।
পরবর্তীতে করা হয় ইন্ডাক্ট/Induct বা অন্তর্ভুক্তি। আইনি চাপের মুখে থাকা সেই নেতাকে গেরুয়া উত্তরীয় পরিয়ে অত্যন্ত আড়ম্বরের সঙ্গে বিজেপিতে স্বাগত জানানো হয়।
সবশেষে Inaugurate বা অভিষেক। দলবদলের পুরস্কার হিসেবে তাঁদের বসানো হয় কোনো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট মন্ত্রীর পদে।
২০২৫ সালে ভারতীয় পার্লামেন্টে কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিগত ১০ বছরে রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে ইডির দায়ের করা ১৯০টিরও বেশি মামলার মধ্যে মাত্র দুটিতে সাজা হয়েছে। দ্য ওয়্যার ও স্ক্রলসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ইডির জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়া রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ৯০ শতাংশেরও বেশি বিরোধী দলের নেতা। পরবর্তীতে এদের মধ্যে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বা শুভেন্দুর মতো নেতারা বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী হন।
হিমন্ত বিশ্ব শর্মা (আসাম): এই প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতাকে দলে টানার পেছনে বিজেপির নিজস্ব নীতি বিসর্জনের এক বড় উদাহরণ রয়েছে। ২০১৫ সালে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার আগে বহুজাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘লুই বার্জার ঘুষ কেলেঙ্কারিতে’ হিমন্তের জড়িত থাকার অভিযোগ বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করেছিল মোদি সরকার। পরবর্তীতে সেই অভিযোগের তোয়াক্কা না করে তাঁকে দলে নেওয়া হয় এবং বর্তমানে তিনি কেবল আসামের মুখ্যমন্ত্রীই নন, বরং উত্তর-পূর্ব ভারতে বিজেপির প্রধান রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রক বা আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছেন।
তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান এই সংগঠককে ২০১৬ সালের বহুল আলোচিত ‘নারদ স্টিং অপারেশন’ বা নারদ-কাণ্ডে ক্যামেরার সামনে প্রকাশ্যে নগদ অর্থ গ্রহণ করতে দেখা গিয়েছিল। এ ছাড়া সারদা কেলেঙ্কারির মতো বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে এনেছিল বিজেপি। তবে দলবদল করার পর সেই পুরোনো দুর্নীতির অভিযোগগুলো থেকে তিনি মুক্তি পান এবং অভিযোগগুলো এক সময়ে এসে নাই হয়ে যায়। আজ সেই শুভেন্দু অধিকারীই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রথম মুখ্যমন্ত্রী।
বিজেপি থেকে বিহারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন সম্রাট চৌধুরী। অতীতে রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) ও জনতা দলের (জেডিইউ) হয়ে রাজনীতি করেছিলেন সম্রাট চৌধুরী। তাঁর অতীতও একাধিক বিতর্কে ঘেরা। ১৯৯৫ সালের একটি খুনের মামলায় তাঁর জড়িত থাকার অভিযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি বয়স জালিয়াতি করে নিজেকে নাবালক দাবি করার এবং ভুয়া ডক্টরেট ডিগ্রি ব্যবহার করার বিতর্কও তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। তবে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর এই সমস্ত বিতর্ক ও অভিযোগ অনায়াসেই আড়ালে চলে গেছে।
এ ছাড়া অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খাণ্ডু নিজের পুরো সরকার নিয়ে তিন তিনটি দল পরিবর্তন করে অবশেষে বিজেপির ঝাণ্ডার তলে নিজের আসন টিকিয়ে রেখেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে নরেন্দ্র মোদির আরও একটি স্লোগান বেশ জনপ্রিয় হয়েছে—‘জো লুটা ও লৌটানা হোগা’ অর্থাৎ যা লুট করা হয়েছে, তা ফেরত দিতে হবে। কিন্তু এটি আজ একটি ফাঁপা বুলি ছাড়া আর কিছুই নয়। মোদির কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, ‘লুট হওয়া অর্থ’ ফিরিয়ে আনা তাঁর উদ্দেশ্য নয়। তাঁর উদ্দেশ্য দলবদল করে আসা এসব নতুন মুখ্যমন্ত্রীর মাধ্যমে বিজেপির নিজস্ব রাজনৈতিক কোষাগার পূর্ণ করা।
এক সময় যাদের ‘লুটেরা’ বলে গালি দেওয়া হয়েছিল, দলের সর্বোচ্চ পদে তাদের বসিয়ে বিজেপি এই বার্তাই দিচ্ছে—দুর্নীতি কেবল তখনই অপরাধ, যখন আপনি বিরোধী দলের জার্সি পরে মাঠে নামবেন। অর্থাৎ মোদির ভারতে মুখ্যমন্ত্রীর বাংলোর চাবি পাওয়ার জন্য এখন আর কোনো আদর্শিক আনুগত্যের প্রয়োজন পড়ে না; দুর্নীতির অভিযোগের পর সুযোগ বুঝে দলবদলই মসনদে বসার জন্য যথেষ্ট।