রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দল ইউনাইটেড রাশিয়া দেশটির পার্লামেন্ট নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া সরকারি ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এই নির্বাচনে কার্যত কোনো বিরোধী দল অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়নি। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
স্থানীয় সময় গতকাল সোমবার প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, তিন দিন ধরে চলা ভোটগ্রহণ রোববার শেষ হওয়ার পর ইউনাইটেড রাশিয়া ৫৮ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে। ২৫ বছর ধরে রাশিয়ার রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে আসা দলটি নিম্নকক্ষ স্টেট ডুমার তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি আসন পেতে যাচ্ছে।
২০২২ সালে রুশ বাহিনী ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর এটি ছিল রাশিয়ার প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন। একই সঙ্গে ইউক্রেনের চারটি অঞ্চলের বাসিন্দাদেরও এই নির্বাচনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ওই অঞ্চলগুলো ২০২২ সালে রাশিয়া দখল করে এবং পরে মস্কো সেগুলোকে অবৈধভাবে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করে নেয়।
মস্কো থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক দিমিত্রি মেদভেদেনকো বলেন, নির্বাচনের ফলাফল এবং প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি মস্কোকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে। বিশেষ করে ইউক্রেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে রাশিয়ার জনগণের সমর্থন রয়েছে বলে মস্কো এটিকে দেখাতে পারে।
রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান এলা পামফিলোভা বলেন, রাশিয়ার একমাত্র নিবন্ধিত যুদ্ধবিরোধী দল ইয়াব্লোকো জাতীয় পর্যায়ে কোনো আসন পায়নি। গত মাসে রাশিয়ার সুপ্রিম কোর্ট দলটিকে ব্যালট থেকে বাদ দিয়েছিল। ফলে একক আসনের নির্বাচনী এলাকায় দলটির মাত্র কয়েক ডজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পান। তবে পশ্চিম রাশিয়ার নভগোরোদ অঞ্চলের আঞ্চলিক পার্লামেন্টে ইয়াব্লোকো জয় পেয়েছে। দলটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছে, তারা প্রায় ১২ হাজার ভোট পেয়েছে, যা মোট ভোটের ৬ শতাংশের সামান্য বেশি। এই ভোট আঞ্চলিক আইনসভায় প্রবেশের জন্য যথেষ্ট ছিল।
ইয়াব্লোকো এবং কমিউনিস্ট পার্টি জানিয়েছে, তাদের অনেক পর্যবেক্ষককে ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কমিউনিস্ট পার্টি সরকারের কিছু নীতির সমালোচনা করলেও পুতিনের সরাসরি সমালোচনা থেকে সতর্কভাবে বিরত থেকেছে।
কমিউনিস্ট পার্টি ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে পার্লামেন্টে প্রবেশ করেছে এবং ৪০টি ডুমা আসন পেয়েছে। জাতীয়তাবাদী এলডিপিআর দল পেয়েছে ২৫টি আসন এবং নিউ পিপল পার্টি পেয়েছে ২০টি আসন।
রাশিয়া ইউরোপে নিরাপত্তা ও সহযোগিতা সংস্থা (ওএসসিই) থেকে কোনো পর্যবেক্ষককে নির্বাচনে আমন্ত্রণ জানায়নি। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর আগে রাশিয়ার সমালোচনার ক্ষেত্রে ওএসসিইকে ‘দ্বৈত মানদণ্ড’ অনুসরণের অভিযোগ করেছিল। ওএসসিই পার্লামেন্টারি অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট পেরে হোয়ান পন্স বলেন, পর্যবেক্ষকদের বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সদস্য দেশ হিসেবে রাশিয়ার দেওয়া প্রতিশ্রুতির লঙ্ঘন।
অনেক রাশিয়ানই নির্বাচনের ফলাফলে তেমন অবাক হননি। মস্কোর বাসিন্দা তাতিয়ানা বলেন, ‘সকালে দেখলাম ইউনাইটেড রাশিয়া এগিয়ে আছে। সম্ভবত এতে কারও কাছে বিস্ময়ের কিছু নেই।’ তিনি কী পরিবর্তন দেখতে চান, জানতে চাইলে তাতিয়ানা বলেন, ‘আমি মনে করি সবচেয়ে জরুরি বিষয়টি সবাই জানে, সেটি হলো ইউক্রেনের সংঘাত। আমি চাই এটি যত দ্রুত সম্ভব শেষ হোক, সম্ভব হলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে।’
যুদ্ধ অব্যাহত থাকায় এমন কিছু নীতি আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যেগুলোর প্রভাব ক্রমেই সাধারণ রাশিয়ানদের ওপর পড়ছে। পার্লামেন্টে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও এই পরিস্থিতির গতিপথ পরিবর্তন করা কঠিন হতে পারে।
কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের তাতিয়ানা স্তানোভায়া এক অনলাইন মন্তব্যে বলেন, ‘পুতিন অবশ্যই ইউনাইটেড রাশিয়ার ফলাফলকে যুদ্ধের প্রতি জনগণের সমর্থনের প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন। যদিও বাস্তবে তা নয়। যুদ্ধ শেষ করার সামগ্রিক দাবি বাড়ছে।’ তিনি লিখেছেন, ‘মূল প্রশ্ন হলো, এখন কী? সেনা সমাবেশ, নতুন করে দমন-পীড়ন, আরও কঠোর পদক্ষেপ এবং সংঘাত বাড়ার বিষয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ রয়েছে।’
ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কায়া কালাস রাশিয়ার ‘তথাকথিত’ নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কালাস বলেন, ‘ক্রেমলিন ভিন্নমতকে স্তব্ধ করেছে, ইউক্রেনে তাদের যুদ্ধের বিরোধিতা করা একমাত্র নিবন্ধিত দলটিকে নিষিদ্ধ করেছে এবং আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষকদেরও বাইরে রেখেছে। রাশিয়ায় গণতন্ত্রের শুধু আবরণটুকুই অবশিষ্ট রয়েছে।’
অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন ও কানাডাসহ পাঁচটি দেশ এক যৌথ বিবৃতিতে রাশিয়ার ‘প্রহসনের’ পার্লামেন্ট নির্বাচনকে নিন্দা জানিয়েছে। বিশেষ করে ইউক্রেনের দখল করা এলাকাগুলোতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে তারা ‘দখলদারত্বের বৃহত্তর ব্যবস্থার অংশ’ বলে অভিহিত করেছে।