হোম > বিশ্ব > ইউরোপ

সার্বিয়ায় ১৪ বছরের ‘স্বৈরশাসনের’ পতন: সরকার গঠন ও আমলাতন্ত্র নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে নেতৃত্বহীন ছাত্ররা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

সার্বিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে স্টুডেন্টস লিস্টের জয়ের পর দেশটির পার্লামেন্ট ভবনের সামনে সমর্থকদের উল্লাস। ছবি: এএফপি

সার্বিয়ায় ঐতিহাসিক নির্বাচনী জয়ের পর সরকার গঠনের আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ আন্দোলন। টানা ১৪ বছর ধরে ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী জাতীয়তাবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতাহীন এই আন্দোলন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, গত রোববার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয়ের পর গতকাল সোমবার পশ্চিম বলকান অঞ্চলের দেশ সার্বিয়ার রাস্তায় নেমে আসেন আন্দোলনটির সমর্থকেরা। সাবেক প্রেসিডেন্ট ও প্রভাবশালী নেতা আলেকসান্দার ভুচিচের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে দেশটির রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে।

রোববার গভীর রাতে পরাজয় স্বীকার করেন ভুচিচ। এর মধ্য দিয়ে সার্বিয়ার রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘদিনের আধিপত্যের আকস্মিক অবসান ঘটে। একই সঙ্গে দুই বছর ধরে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হয়। ২০২৪ সালে নোভি সাদ রেলস্টেশনে একটি ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনার পর থেকেই এসব বিক্ষোভ শুরু হয়।

বেলগ্রেডভিত্তিক সেন্টার ফর ফ্রি ইলেকশনস অ্যান্ড ডেমোক্রেসির (সিইএসআইডি) প্রকাশিত প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ভোটের নমুনার ১০০ শতাংশ গণনা শেষে স্টুডেন্ট লিস্ট ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এতে ২৫০ আসনের সংসদে আন্দোলনটি ১৪১টি আসন পেতে যাচ্ছে। অন্যদিকে ভুচিচের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি (এসএনএস) পেয়েছে ৩৯ শতাংশ ভোট, যা দলটিকে ১০৩টি আসন দিচ্ছে। বাকি আসনগুলো পেয়েছে জাতীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো।

তবে বিজয়ী আন্দোলনটি কীভাবে সরকার পরিচালনা করবে, সে বিষয়ে এখনো তেমন কোনো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। আন্দোলনটি সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এর প্রার্থীদের মধ্যে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষাবিদ, অভিনেতা ও কৃষকেরাও ছিলেন। কিন্তু আন্দোলনটি সচেতনভাবেই কোনো একক নেতা বা সাংগঠনিক স্তরবিন্যাস ছাড়া পরিচালিত হয়েছে। ফলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং কারা মন্ত্রিসভায় স্থান পাবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

স্টুডেন্ট লিস্টের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন আন্দোলনটির প্রার্থী তালিকার নেতৃত্ব দেওয়া হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ইলিয়া সার্দানোভিচ, সার্বিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর দেজান শোশকিচ এবং বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক রাদোমির সাইচিচ। নির্বাচনে জয়ের পর আন্দোলনটির পক্ষে বক্তব্য দেন সাইচিচ।

এ বছরের বসন্তে হাঙ্গেরিতে ভিক্টর অরবানের ১৬ বছরের উদার গণতন্ত্রবিরোধী শাসনের অবসান ঘটানো পিটার ম্যাগিয়ারের টিসা পার্টির মতোই সার্বিয়ার স্টুডেন্ট লিস্টকেও এমন এক সরকারি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে, যেখানে প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বিদায়ী সরকারের প্রতি অনুগত কর্মকর্তারা রয়েছেন। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কার আনা আন্দোলনটির জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী ও স্টুডেন্ট লিস্টের প্রার্থী আনা মিরকোভিচ বলেন, ‘শিক্ষার্থী আন্দোলনের প্রত্যেক সদস্য এবং তালিকার প্রত্যেক প্রার্থীই আমাদের সামনে থাকা দায়িত্বের গুরুত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন এবং তাঁদের উপলব্ধি একেবারেই স্পষ্ট।’ তিনি বলেন, ‘আমরা এই নির্বাচনী ফলাফলকে ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা অর্জন হিসেবে দেখছি না। বরং নিজেদের জনগণ এবং নিজেদের সন্তানদের কাছে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব গ্রহণ হিসেবে দেখছি। নতুন সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হবে দেশের “সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিষমুক্তি” নিশ্চিত করা।’

ভুচিচের ১৪ বছরের শাসনব্যবস্থাকে অনেকেই স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের ‘ক্লাসিক্যাল টেক্সটবুক এক্সাম্পল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দল গণমাধ্যম, বিচার বিভাগ এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারিত করেছে। এ সময় নির্বাচনেও ভোটার নিবন্ধনে অনিয়ম, গণমাধ্যমে পক্ষপাত এবং ভোটারদের ঘুষ দেওয়ার মতো অভিযোগ উঠেছে। স্টুডেন্ট লিস্টের নির্বাচনী কর্মসূচির কেন্দ্রে রয়েছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এবং আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। এ লক্ষ্যে আন্দোলনটি প্রসিকিউটরদের কাছে জবাবদিহি করবে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে নয়, এমন একটি স্বাধীন পুলিশ ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি সংগঠিত অপরাধচক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বাহিনী থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোতে ক্ষমতাসীন দলের অনুগত ব্যক্তিদের নিয়োগ নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনাও রয়েছে আন্দোলনটির। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের অপব্যবহার ঠেকাতে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের সব চুক্তি ও আর্থিক লেনদেনের ওপর নতুন স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জনসাধারণের জন্য সেগুলো যাচাইয়ের সুযোগ উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা।

মিরকোভিচ বলেন, নতুন সরকার এমন একটি ‘ভয় দেখানোর ব্যবস্থা’ ভেঙে দেবে, যা মানুষের মধ্যে ভীতি ও মেরুকরণ তৈরি করেছে। এ জন্য গণমাধ্যমকে ‘জরুরিভাবে উন্মুক্ত’ করা হবে, সরকারি খাতের কর্মীদের ওপর চাপ প্রয়োগ বন্ধ করা হবে এবং ‘প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতার অবসান’ ঘটানো হবে। তিনি আরও বলেন, লক্ষ্য হচ্ছে ‘সমাজকে একেবারে গোড়া থেকে পুনর্গঠন করা।’ এর মধ্যে রয়েছে সব চুক্তি ও আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ, বিচার বিভাগকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করা ও শক্তিশালী করা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কার। তাঁর ভাষায়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে কুক্ষিগত করার সুযোগ ‘আর কখনোই’ দেওয়া যাবে না।

স্টুডেন্ট লিস্ট সচেতনভাবেই বিভাজন সৃষ্টিকারী পররাষ্ট্রনীতির বিষয়গুলোকে আড়ালে রেখেছিল। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ও রয়েছে। সোমবার ক্রেমলিন জানিয়েছে, তারা আশা করে, সার্বিয়ার নতুন নেতারা বুঝতে পারবেন যে রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা সার্বিয়ার স্বার্থের অনুকূল।

বিশ্লেষক দুসান ভুচিচেভিচ বলেন, আন্দোলনটি শুরু থেকেই যতটা সম্ভব জোর দিয়ে বলেছে যে সার্বিয়ার প্রথম ও প্রধান কাজ হওয়া উচিত দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান করা। তাঁর ভাষায়, ‘জাতীয় পর্যায় থেকে স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে আক্ষরিক অর্থেই ভেঙে পুনর্গঠন করার বিষয়টি’ ছিল আন্দোলনটির অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে।

শিক্ষার্থীদের এই বিজয় সার্বিয়ার রাজনীতিতে এক গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থী আন্দোলনগুলোর জন্য এটি অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে। এসব আন্দোলন উন্নত শিক্ষার মান এবং ভবিষ্যতে ভালো সুযোগ-সম্ভাবনার দাবিতে বিক্ষোভ করছে।

তবে ভুচিচেভিচ বলেন, সার্বিয়ার আন্দোলনটি অন্য প্রতিবাদ আন্দোলনগুলোর চেয়ে আলাদা। বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ের গণতন্ত্রের এই পরীক্ষাটি শেষ পর্যন্ত ৫০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেতে সক্ষম হয়েছে।’ তবে একই ধরনের মডেল অন্য দেশেও কার্যকর হবে কি না, তা এখনো ‘স্পষ্ট নয়।’

বেলগ্রেডভিত্তিক সেন্টার ফর কনটেম্পরারি পলিটিকসের কর্মসূচি পরিচালক নিকোলা বুরাজের সোমবার বলেন, আন্দোলনটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও আরও দ্রুত করতে হবে। তাঁর মতে, প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতেই ‘আসলে দীর্ঘ সময়, কয়েক মাস লেগেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ উদ্যাপন শেষ করে এবং গতকাল কী ঘটেছে, তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করার পর আমরা সামনে কী আসছে এবং সরকার দেখতে কেমন হবে, সেদিকে আরও বেশি মনোযোগ দেব। মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগেও এসব কিছু কল্পনার মতো মনে হচ্ছিল।’

রোববার পরাজয় স্বীকার করার সময় ভুচিচ তাঁর দলের হারের জন্য ‘বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ডিপ স্টেটের সরাসরি সমর্থনকে’ দায়ী করেন। তাঁর দাবি, এই ডিপ স্টেট মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও বিরোধী। পুরো শাসনামলে ভুচিচ রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।

সার্বিয়ার সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে নতুন সংসদের অধিবেশন বসতে হবে। এরপর নতুন সরকার গঠনের জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯০ দিন। এ ছাড়া দেশটিতে আগামী ২৭ ডিসেম্বরের আগেই নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য ভুচিচ প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোয় এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

পুতিনের প্রাসাদ ঘিরে ৫০ আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট, নতুন করে বসানো হয়েছে ১৫টি

সার্বিয়ায় প্রেসিডেন্ট ভুচিচের পতন, নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের বিপুল জয়

২০৩০ সালের মধ্যে ব্রিটেনে হামলার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে শত্রুরা: প্রতিরক্ষামন্ত্রী

ফ্রান্সে ৪ লাখ মানুষের বিক্ষোভ, বাড়ছে উত্তেজনা–সংঘর্ষ

ফ্রান্সে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে লাখো মানুষের বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার ১০০০

শিল্পীদের মাসিক ভাতা দিচ্ছে আয়ারল্যান্ড সরকার, শিল্পের জন্য কতটা উপকারী

ফের বিক্ষোভের প্রস্তুতি ফ্রান্সে, মাখোঁর পদত্যাগ দাবি

ইউক্রেনীয় সেনার শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযান: নিজেই কাটেন নিজের পা, ফেরেন ড্রোনে ঝুলে

লন্ডনে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ভাই আনিসুজ্জামানের ১৫ মিলিয়ন পাউন্ডের ফ্ল্যাট জব্দ

মেলানিয়ার কথায় ‘যুদ্ধ থামল’ ইউক্রেনের এক শহরে