পারিবারিক সহিংসতা ও নির্যাতনের রেকর্ড থাকা অপরাধীদের নাম সংবলিত একটি উন্মুক্ত সরকারি তালিকা বা পাবলিক রেজিস্টার তৈরির লক্ষ্যে এক ঐতিহাসিক আইন অনুমোদন করেছে আয়ারল্যান্ড। ‘জেনি আইন’ নামে পরিচিত এই আইনের ফলে সাধারণ মানুষ এখন থেকে কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর আগে তাঁর অতীতে সহিংস আচরণের ইতিহাস রয়েছে কি না, তা যাচাই করে নিতে পারবেন।
পারিবারিক সহিংসতার শিকার ও অধিকারকর্মীরা আয়ারল্যান্ড সরকারের এই উদ্যোগকে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করছেন।
গত বুধবার আয়ারল্যান্ডের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ‘ডেইল’-এ বিলটি পাস হয়। এ সময় পার্লামেন্টের গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন জেনিফার পুলের পরিবারের সদস্যরা, যাঁদের দীর্ঘ লড়াইয়ের পর এই আইনটি আলোর মুখ দেখল। বিলটি পাস হওয়ার পর আইনপ্রণেতারা দাঁড়িয়ে জেনিফারের পরিবারকে সম্মান জানান।
২০২১ সালের এপ্রিল মাসে দুই সন্তানের জননী ২৪ বছর বয়সী জেনিফার পুল তাঁর সঙ্গীর হাতে নৃশংসভাবে খুন হন। জেনিফার জানতেন না যে তাঁর সেই সঙ্গীর অতীতে অন্য একজন সঙ্গীকে গুরুতরভাবে মারধর করার অপরাধে জেল খাটার ইতিহাস রয়েছে।
জেনিফারের অকালমৃত্যুর পর তাঁর পরিবার আয়ারল্যান্ডে এমন একটি উন্মুক্ত ব্যবস্থা চালুর জন্য ক্যাম্পেইন শুরু করে, যাতে অন্য কোনো নারীকে না জেনে কোনো অপরাধীর সঙ্গে এক ছাদের নিচে বাস করতে না হয়।
জেনিফারের ভাই জেসন পুল আইরিশ গণমাধ্যম আরটিই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘এটি পারিবারিক সহিংসতার সংস্কৃতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি বিশাল অগ্রগতি। আমার বোন জানত না সে কার সঙ্গে বাস করছে। এই রেজিস্টারের কারণে এখন অন্য নারীরা অন্তত জানতে পারবেন তাঁর সম্ভাব্য সঙ্গীটি আসলে কেমন।’
আইন অনুযায়ী, গুরুতর পারিবারিক সহিংসতা, ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, গলা চেপে শ্বাসরোধের চেষ্টা, অবদমনমূলক নিয়ন্ত্রণ বা মানসিক নির্যাতন এবং সম্মতি ছাড়া অন্তরঙ্গ ছবি ছড়ানোর মতো অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের নাম এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
১. মামলার রায় দেওয়া বিচারক মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে অপরাধীর নাম প্রকাশ করা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখবেন।
২. অপরাধীর নাম তালিকায় প্রকাশ করার আগে ভুক্তভোগী বা নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির স্পষ্ট সম্মতি প্রয়োজন হবে।
৩. সাজা পাওয়ার অন্তত তিন বছর পর দণ্ডিত ব্যক্তি তাঁর নাম তালিকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আবেদন করার সুযোগ পাবেন।
এই নতুন পাবলিক রেজিস্টারের মাধ্যমে আয়ারল্যান্ড নিজেকে পুরো ইউরোপের মধ্যে একটি অনন্য ও অগ্রগামী অবস্থানে নিয়ে গেল।
যুক্তরাজ্যে বর্তমানে ‘ক্লেয়ার’স ল’ (Clare’s Law) নামের একটি আইন রয়েছে, যার অধীনে কোনো ব্যক্তি তাঁর সঙ্গীর অতীত অপরাধের রেকর্ড জানতে পুলিশের কাছে আবেদন করতে পারেন। তবে এই তথ্য সরাসরি অনলাইনে উন্মুক্ত নয় এবং কেবল পুলিশ প্রশাসন চাইলে তবেই তা প্রকাশ করা হয়। যুক্তরাজ্যের এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই ধীরগতি এবং বৈষম্যমূলকভাবে তথ্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
কিন্তু আয়ারল্যান্ডে এটি সরাসরি অনলাইন রেজিস্টার হিসেবে উন্মুক্ত হওয়ায় এটি অনেক বেশি সহজলভ্য ও স্বচ্ছ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
আইরিশ নারী অধিকার সংস্থা ‘উইমেনস এইড আয়ারল্যান্ড’-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে পারিবারিক সহিংসতার চিত্র ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত আয়ারল্যান্ডে আটজন নারী সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন, যা ২০১৫ সালের পুরো বছরের মোট সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
সংস্থাটির তথ্যমতে, আয়ারল্যান্ডের প্রতি তিনজনে একজন নারী কোনো না কোনোভাবে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন। আর এই সহিংসতার মূল হুমকিটি আসে অপরিচিত কোনো ব্যক্তির চেয়ে নারীর খুব কাছের মানুষের কাছ থেকেই।
জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা (ইউএন উইম্যান)-র সর্বশেষ ২০২৪ সালের বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সে বছর ৮৩ হাজার নারী ও মেয়ে শিশুকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশেরও বেশি (প্রায় ৫০,০০০) হত্যাকাণ্ড ঘটেছে স্বামী, সঙ্গী বা পরিবারের কোনো সদস্যের হাতে।
পরিসংখ্যানটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন গড়ে ১৩৭ জন নারী বা মেয়ে শিশু পরিবারের ভেতরের কোনো মানুষের হাতে প্রাণ হারাচ্ছেন, যা প্রতি ১০ মিনিটে একজনের মৃত্যুর সমান। আয়ারল্যান্ডের নতুন এই আইন এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় এবং নারীদের সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী আইনি ঢাল হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন