রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির এক সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে বিরল জনবিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। মাত্র ছয় মাস আগে নিয়োগ পাওয়া জনপ্রিয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে হঠাৎ পদচ্যুত করায় রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল Hands off Fedorov বা ‘ফেদোরভকে সরাবেন না’ এবং Stop sabotaging victory! বা ‘বিজয়কে বাধাগ্রস্ত করা বন্ধ করুন’ লেখা প্ল্যাকার্ড। তাদের অভিযোগ, যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সফল এক সংস্কারককে সরিয়ে দিয়ে সরকার বড় ভুল করেছে।
মাত্র ৩৫ বছর বয়সী ফেদোরভ ইউক্রেনের রাজনীতিতে প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। ২০১৯ সালে জেলেনস্কির নির্বাচনী প্রচারণার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কৌশল পরিচালনার মাধ্যমে তিনি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান। এরপর তিনি দেশটির প্রথম ডিজিটাল রূপান্তরমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ‘দিয়া’ (Diia) নামের বহুল জনপ্রিয় সরকারি অ্যাপ চালু করেন। ‘রাষ্ট্র এখন স্মার্টফোনে’—এই ধারণার ভিত্তিতে তৈরি অ্যাপটির মাধ্যমে নাগরিকেরা গাড়ি নিবন্ধন, বিয়ে, তালাকসহ নানা সরকারি সেবা ঘরে বসেই গ্রহণ করতে পারেন।
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু হলে ফেদোরভের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কের কাছে প্রকাশ্যে আবেদন জানিয়ে ইউক্রেনে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট চালু করান, যা যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় বাহিনীর যোগাযোগব্যবস্থার প্রাণশক্তিতে পরিণত হয়। চলতি বছর তিনি রাশিয়ার অননুমোদিত স্টারলিংক ব্যবহারও বন্ধ করতে ভূমিকা রাখেন।
একই সঙ্গে ফেদোরভ ‘আর্মি অব ড্রোনস’ কর্মসূচির মাধ্যমে ড্রোননির্ভর যুদ্ধকৌশলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলার তথ্য বিশ্লেষণ, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সামরিক ইউনিটগুলোর জন্য প্রণোদনাভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে তিনি ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়ার পরও দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে অগ্রাধিকার দেন।
তবে তাঁর সংস্কার প্রচেষ্টা সেনাপ্রধান ওলেক্সান্দর সিরস্কির সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি করে। ফেদোরভ প্রকাশ্যে দাবি করেন, তিনি প্রেসিডেন্টকে সিরস্কি ও চিফ অব জেনারেল স্টাফ আন্দ্রি হনতভকে বদলানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত প্রায় সব সংস্কারই সেনা সদর দপ্তর আটকে দিয়েছে।
জেলেনস্কিও স্বীকার করেছেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই ‘পদ্ধতিগত’ বিরোধ চলছিল। তবে তিনি সিরস্কিকে সরানোর পরিকল্পনা নেই জানিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। এর কিছুদিন পরই ফেদোরভকে অপসারণের সিদ্ধান্ত আসে।
এই সিদ্ধান্তে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সেনাবাহিনীর সদস্য ও সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশও ক্ষুব্ধ। একজন ইউক্রেনীয় সেনা সদস্য বিবিসিকে বলেছেন, ‘জেলেনস্কির প্রেসিডেন্সির সবচেয়ে বড় ভুল এটি।’ কিয়েভের এক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘আমরা ফেদোরভের কাজের ফল দেখেছি। তিনি সৈন্যদের অনুপ্রাণিত করেছেন। তাই তাঁর পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব।’
ফেদোরভকে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা হিসেবে থেকে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, জেলেনস্কির বিরুদ্ধে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ নেই এবং তিনি বিশ্বাস করেন, শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট জনগণের কণ্ঠস্বর শুনবেন।
ইউক্রেনের পার্লামেন্টে এখন নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু ফেদোরভকে ঘিরে যে জনসমর্থন ও বিক্ষোভ দেখা গেছে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে—যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনে তিনি শুধু একজন মন্ত্রী নন, বরং প্রযুক্তিনির্ভর নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।