হোম > বিশ্ব > চীন

সাগরতলের মানচিত্র বানাচ্ছে চীন, সাবমেরিন যুদ্ধের প্রস্তুতি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

চীনের সাবমেরিন। ছবি: সিনহুয়া

চীন প্রশান্ত, ভারত ও আর্কটিক মহাসাগরজুড়ে বিস্তৃত সমুদ্রতলের এক বিশাল ম্যাপিং বা মানচিত্রায়ন ও নজরদারি কার্যক্রম চালাচ্ছে। এতে সমুদ্রের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এমন বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা নৌবিশেষজ্ঞদের মতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে সাবমেরিন যুদ্ধ পরিচালনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

চীনের ওশান ইউনিভার্সিটি অব চায়না পরিচালিত ‘ডং ফাং হং–৩’ জাহাজটি ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তাইওয়ানের কাছাকাছি সাগর, মার্কিন ঘাঁটি গুয়ামের আশপাশ ও ভারত মহাসাগরের কৌশলগত এলাকায় বারবার যাতায়াত করেছে। রয়টার্সের পর্যালোচনা করা জাহাজ ট্র্যাকিং থেকে এই তথ্য দেখা গেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে জাপানের নিকটবর্তী সমুদ্রতলে স্থাপন করা শক্তিশালী চীনা সেন্সরগুলোর একটি সেট পরীক্ষা করে জাহাজটি। এসব সেন্সর পানির নিচের বস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম। গত মে মাসে একই এলাকায় আবারও যায় জাহাজটি।

ওশান ইউনিভার্সিটি অব চায়নার দাবি, জাহাজটি কাদামাটি জরিপ ও জলবায়ু গবেষণা করছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে দেখা যায়, এই জাহাজ ব্যাপক গভীর সমুদ্র মানচিত্রায়নও করেছে। নৌযুদ্ধ বিশেষজ্ঞ ও মার্কিন নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, ‘ডং ফাং হং-৩’ যে ধরনের গভীর সমুদ্রের তথ্য সংগ্রহ করছে, অর্থাৎ মানচিত্রায়ন ও সেন্সর স্থাপনের মাধ্যমে, তা চীনকে সমুদ্রতলের অবস্থা সম্পর্কে এমন ধারণা দিচ্ছে, যা সাবমেরিন মোতায়েন আরও কার্যকর করতে এবং প্রতিপক্ষের সাবমেরিন শনাক্ত করতে সহায়ক হবে।

‘ডং ফাং হং-৩’ একা নয়। এমন বহু গবেষণা জাহাজ ও শত শত সেন্সর নিয়ে গঠিত বৃহত্তর এক সমুদ্র মানচিত্রায়ন ও নজরদারি কর্মসূচি চালাচ্ছে চীন। রয়টার্স এই কার্যক্রম অনুসন্ধান করতে গিয়ে চীনা সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নথি, জার্নাল নিবন্ধ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা বিশ্লেষণ করেছে। পাশাপাশি নিউজিল্যান্ডের স্টারবোর্ড মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স নির্মিত একটি জাহাজ-ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রশান্ত, ভারত ও আর্কটিক মহাসাগরে সক্রিয় ৪২টি গবেষণা জাহাজের পাঁচ বছরের বেশি সময়ের গতিবিধিও পর্যালোচনা করেছে।

এই গবেষণার বেসামরিক উদ্দেশ্যও আছে। কিছু জরিপ মাছ ধরার এলাকা বা খনিজ অনুসন্ধান চুক্তিবদ্ধ অঞ্চলে পরিচালিত হচ্ছে। তবে রয়টার্সের অনুসন্ধান পর্যালোচনা করা ৯ জন নৌযুদ্ধ বিশেষজ্ঞের মতে, এর সামরিক উদ্দেশ্যও স্পষ্ট। পানির নিচের ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য গবেষণা জাহাজগুলো সমুদ্রতল বরাবর ঘন সমান্তরাল রেখায় সামনে-পেছনে চলতে চলতে মানচিত্র তৈরি করে। ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, রয়টার্স যে জাহাজগুলো পর্যবেক্ষণ করেছে, তারা প্রশান্ত, ভারত ও আর্কটিক মহাসাগরের বিস্তীর্ণ অংশে এ ধরনের গতিবিধি করেছে।

রয়টার্সের নজরদারিতে থাকা অন্তত আটটি জাহাজ সরাসরি সমুদ্রতল মানচিত্রায়ন করেছে। আরও দশটি জাহাজে এ কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম ছিল বলে চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত জাহাজের বিবরণ এবং সরকারি সংস্থার বিজ্ঞপ্তি পর্যালোচনায় দেখা গেছে। অস্ট্রেলিয়ার সাবমেরিন বাহিনীর সাবেক প্রধান পিটার স্কট বলেন, এই জরিপ তথ্য চীনা সাবমেরিনের জন্য সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুত করতে ‘অমূল্য’ হতে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘যেকোনো দক্ষ সাবমেরিন কর্মকর্তা তাঁর কার্যপরিধির পরিবেশ সম্পর্কে গভীরভাবে বোঝার জন্য ব্যাপক চেষ্টা করবেন।’

জাহাজ ট্র্যাকিং তথ্য বলছে, চীনের এই সমুদ্রতল জরিপ আংশিকভাবে ফিলিপাইনের আশপাশ, গুয়াম ও হাওয়াইয়ের নিকটবর্তী জলসীমা এবং উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে ওয়েক অ্যাটলের মার্কিন সামরিক স্থাপনার কাছে কেন্দ্রীভূত। ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক এবং সাবেক অস্ট্রেলীয় অ্যান্টি-সাবমেরিন যুদ্ধ কর্মকর্তা জেনিফার পার্কার বলেন, ‘তারা যা করছে তা সম্পদ অনুসন্ধানের চেয়ে অনেক বেশি।’ তাঁর মতে, ‘এর ব্যাপ্তি দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায় তারা এমন এক দূরপাল্লার সমুদ্রগামী নৌবাহিনী গড়ে তুলতে চায়, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে সাবমেরিন অভিযান।’

পার্কার ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্যে তথ্য সংগ্রহ করা হলেও বেসামরিক গবেষণা ও সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়নের সমন্বয় চীনা সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের অধীনে বেইজিং এই নীতিকে ‘সিভিল-মিলিটারি ফিউশন’ নামে উল্লেখ করে। সমুদ্রতল মানচিত্রায়ন ও নজরদারি কার্যক্রম নিয়ে মন্তব্য চেয়ে পাঠানো প্রশ্নের জবাব চীনের প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয় দেয়নি।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরও রয়টার্সের প্রশ্নের উত্তর দেয়নি।

এ মাসে কংগ্রেসের একটি কমিশনে দেওয়া সাক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ গোয়েন্দা দপ্তরের প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাইক ব্রুকস বলেন, চীন জরিপ কার্যক্রম নাটকীয়ভাবে বাড়িয়েছে। এতে এমন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যা সাবমেরিনের নেভিগেশন, গোপন অবস্থান গ্রহণ এবং সমুদ্রতলে সেন্সর বা অস্ত্র স্থাপনে সহায়তা করে। তিনি আরও বলেন, চীনা গবেষণা জাহাজগুলোর সম্ভাব্য সামরিক গোয়েন্দা সংগ্রহ ‘কৌশলগত উদ্বেগ’ তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রও সম্প্রতি নিজস্ব সমুদ্র মানচিত্রায়ন ও নজরদারি কর্মসূচি নতুন করে সাজিয়েছে।

প্রশান্ত, ভারত ও আর্কটিক মহাসাগর জুড়ে চীনের মানচিত্রায়ন ও নজরদারির ব্যাপ্তি এই প্রথম প্রকাশ্যে এল। এর আগে গুয়াম ও তাইওয়ান ঘিরে এবং ভারত মহাসাগরের কিছু অংশে এই প্রচেষ্টার আংশিক চিত্র সামনে এসেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নেভাল ওয়ার কলেজে চীনের সামুদ্রিক কৌশল নিয়ে বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক রায়ান মার্টিনসন বলেন, ‘চীনের সামুদ্রিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিশাল পরিসর সত্যিই বিস্ময়কর।’ তিনি আরও বলেন, ‘দশকের পর দশক যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ধরে নিতে পারত যে সমুদ্র যুদ্ধক্ষেত্র সম্পর্কে তাদের জ্ঞান একতরফাভাবে এগিয়ে। চীনের এই প্রচেষ্টা সেই সুবিধা ক্ষয় করে দিতে পারে। এটি স্পষ্টতই গভীর উদ্বেগের বিষয়।’

পশ্চিমা নৌ বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রতল ও পানির অবস্থা সম্পর্কে চীনা গবেষণা জাহাজ যে তথ্য সংগ্রহ করছে, তা সাবমেরিন পরিচালনা ও সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলীয় প্রতিরক্ষা গবেষক পার্কার বলেন, সবচেয়ে সহজভাবে বলতে গেলে, কমান্ডারদের পানির নিচের ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে জানতে হয় যাতে সংঘর্ষ এড়ানো যায় এবং নিজেদের জাহাজ আড়ালে রাখা যায়।

কিন্তু এই তথ্য সাবমেরিন শনাক্ত করতেও অপরিহার্য। কারণ, এগুলো সাধারণত পানির পৃষ্ঠের কয়েক শ মিটার নিচে পরিচালিত হয়। সাধারণত সাবমেরিন শনাক্ত করা হয় তাদের তৈরি শব্দ বা সোনার সিস্টেম থেকে পাঠানো সংকেতের প্রতিধ্বনির মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সাবমেরিন কমান্ডার এবং বর্তমানে সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির সহকারী সিনিয়র ফেলো টম শুগার্ট বলেন, পানির নিচের ভূপ্রকৃতির ওপর নির্ভর করে শব্দতরঙ্গের গতিপথ বদলে যায়।

শব্দতরঙ্গ ও সাবমেরিনের চলাচল পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা এবং স্রোতের দ্বারাও প্রভাবিত হয়।

এই জরিপে জড়িত জাহাজগুলো চীনের প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয় বা রাষ্ট্র-সম্পর্কিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানাধীন। এর মধ্যে রয়েছে ওশান ইউনিভার্সিটি অব চায়না, যেটির প্রেসিডেন্ট ২০২১ সালে প্রকাশ্যে চীনের নৌবাহিনীর সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক’ এবং ‘সমুদ্রশক্তি ও জাতীয় প্রতিরক্ষা গঠনে’ প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করেছিলেন।

ফিলিপাইনের পূর্বে চীন সবচেয়ে বিস্তৃত সমুদ্র জরিপ পরিচালনা করেছে। এই অঞ্চলটি ‘First Island Chain—প্রথম দ্বীপশৃঙ্খলের’ অংশ, যা উত্তরে জাপানের দ্বীপপুঞ্জ থেকে তাইওয়ান হয়ে দক্ষিণে বোর্নিও পর্যন্ত বিস্তৃত এবং মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের নিয়ন্ত্রণে। এই শৃঙ্খল চীনের উপকূলীয় সমুদ্র ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে একটি প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে।

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক নৌ অ্যাটাশে এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ান নেভাল ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট পিটার লেভি বলেন, ‘প্রথম দ্বীপশৃঙ্খলের মধ্যে আটকে পড়ার আশঙ্কায় তারা আতঙ্কিত।’ তাঁর ভাষায়, চীনের মানচিত্রায়ন ‘ইঙ্গিত দেয় যে তারা সামুদ্রিক পরিবেশ বুঝে সেই ঘেরাও ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়।’

ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, চীনের জরিপে গুয়ামের আশপাশের জলসীমাও অন্তর্ভুক্ত, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পারমাণবিক সাবমেরিন মোতায়েন রয়েছে। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চীনা জাহাজগুলো হাওয়াইয়ের আশপাশের পানির নিচের মানচিত্রায়ন করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্র। পাপুয়া নিউগিনির একটি নৌঘাঁটির উত্তরে পানির নিচের একটি রিজ পরীক্ষা করেছে চীন, যেখানে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশাধিকার পেয়েছে এবং দক্ষিণ চীন সাগর থেকে অস্ট্রেলিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাবমেরিন ঘাঁটির পথে অবস্থিত অস্ট্রেলীয় ভূখণ্ড ক্রিসমাস দ্বীপের আশপাশেও অনুসন্ধান চালিয়েছে।

চীনের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত। তারা ভারত মহাসাগরের বিশাল অংশ মানচিত্রায়ন করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে তেল ও অন্যান্য সম্পদ আমদানির জন্য চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। সাবেক কর্মকর্তা পার্কার বলেন, ‘সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরতার ক্ষেত্রে চীনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা রয়েছে।’ তাঁর মতে, এই জরিপ ‘ইঙ্গিত দেয় যে তারা সম্ভবত ভারত মহাসাগরে আরও বেশি সাবমেরিন অভিযান চালাবে।’

চীনের জাহাজগুলো আলাস্কার পশ্চিম ও উত্তরের সমুদ্রতলও মানচিত্রায়ন করেছে, যা আর্কটিকে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। বেইজিং আর্কটিক অঞ্চলকে একটি কৌশলগত সীমান্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং ২০৩০–এর দশকের মধ্যে একটি মেরু মহাশক্তি হওয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। সাবেক সাবমেরিন কমান্ডার শুগার্ট বলেন, এই বিস্তৃত জরিপ ও সমুদ্রতলের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা ‘চীনের একটি শীর্ষ সামুদ্রিক শক্তি হিসেবে উত্থানের লক্ষণ।’

এর আগে ২০১৪ সালের দিকে উ লিজিন নামের এক বিজ্ঞানী একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা প্রস্তাব করেন, যার লক্ষ্য ছিল সেন্সর স্থাপন করে নির্দিষ্ট সমুদ্র অঞ্চলে পানির অবস্থা ও গতিবিধির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া, অর্থাৎ একটি ‘স্বচ্ছ মহাসাগর’ তৈরি করা। এই তথ্য প্রকাশ করে চায়নিজ একাডেমি অব সায়েন্সেস। শানডং প্রাদেশিক সরকার দ্রুতই এই প্রস্তাবের পক্ষে অন্তত ৮৫ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন দেয় বলে প্রাদেশিক কর্মকর্তারা জানান।

প্রকল্পটি দক্ষিণ চীন সাগর থেকে শুরু হয়। ওশান ইউনিভার্সিটি অব চায়নার প্রকাশ্য বিবৃতি অনুযায়ী, সেখানে তারা এখন গভীর সমুদ্র অববাহিকাজুড়ে একটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা ইউএস অফিস অব নেভাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক ব্রুকস মার্কিন কংগ্রেসের এক কমিশনকে জানান, চীন সমুদ্রতলের নিচে নজরদারি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। এই নেটওয়ার্ক পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও স্রোতের মতো হাইড্রোগ্রাফিক তথ্য সংগ্রহ করে, যাতে সোনারের কার্যকারিতা উন্নত করা যায় এবং দক্ষিণ চীন সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে চলাচলকারী সাবমেরিনগুলোর ওপর স্থায়ী নজরদারি চালানো সম্ভব হয়।

দক্ষিণ চীন সাগরে জরিপ চালানোর পর চীনা বিজ্ঞানীরা ‘স্বচ্ছ মহাসাগর’ প্রকল্পটি প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগর পর্যন্ত সম্প্রসারণ করেন। চীনের প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়, ওশান ইউনিভার্সিটি এবং শানডং প্রাদেশিক সরকারের নথি অনুযায়ী প্রশান্ত মহাসাগরে, জাপানের পূর্বে, ফিলিপাইনের পূর্বে এবং গুয়ামের আশপাশের সমুদ্রে পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও সমুদ্রতলের গতিবিধির মতো পরিবর্তন শনাক্ত করতে চীন শত শত সেন্সর, বয়া এবং সাব-সি অ্যারে স্থাপন করেছে।

চীনা বিজ্ঞান একাডেমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নথিতে দেখা যায়, ভারত মহাসাগরে ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে ঘিরে একটি সেন্সর নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘নাইনটি ইস্ট রিজ’ নামে পরিচিত পানির নিচের একটি পর্বতমালার চূড়াও রয়েছে। চীনা জাহাজগুলো এই রিজ এলাকায়ও অনুসন্ধান চালিয়েছে। এটি বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রতলের পর্বতমালাগুলোর একটি এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মালাক্কা প্রণালির প্রবেশপথের ওপর অবস্থিত, যার মধ্য দিয়ে চীনের তেলের বড় অংশ পরিবাহিত হয়।

ওশান ইউনিভার্সিটি এবং চীনা বিজ্ঞান একাডেমির অধীনস্থ ইনস্টিটিউট অব ওশানোলজি জানিয়েছে, এই বিস্তৃত সেন্সর নেটওয়ার্ক এখন চীনকে পানির অবস্থা ও সমুদ্রতলের গতিবিধি সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহ করছে। তবে কিছু নৌযুদ্ধ বিশেষজ্ঞ এই দাবির ব্যাপারে সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। পানির নিচ থেকে তাৎক্ষণিক তথ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত জটিলতা রয়েছে বলে তারা মনে করেন। তবু বিলম্বিত তথ্যও মূল্যবান। কারণ, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিন কার্যক্রম শনাক্ত করতে চীনকে সহায়তা করতে পারে।

অনেক সেন্সর সংবেদনশীল স্থানে বসানো হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, রয়টার্স সম্প্রতি জানায় যে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ান ও ফিলিপাইনের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে, যাতে চীনের প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশ সীমিত করা যায়। ওশান ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রণালির কিছু অংশে চীন উন্নত সেন্সর স্থাপন করেছে, যেসব পথ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিন দক্ষিণ চীন সাগরে প্রবেশ করতে পারে।

চীনা বিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব সেন্সর জলবায়ু ও সমুদ্রের অবস্থার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে। তবে ২০১৭ সালে শানডং প্রদেশের সরকারি কর্মকর্তারা জানান, ‘স্বচ্ছ মহাসাগর’ প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল ‘সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা’ এবং তারা এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সমুদ্র-সেন্সর নেটওয়ার্ক তৈরির প্রচেষ্টার সঙ্গে সরাসরি তুলনা করেন।

শানডং প্রাদেশিক সরকার, চীনা বিজ্ঞান একাডেমি এবং ইনস্টিটিউট অব ওশানোলজি এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। মানচিত্রায়ন কর্মসূচির প্রতিষ্ঠাতা উ বর্তমানে ছিংদাও ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি ফর মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির মাধ্যমে এই নেটওয়ার্ক তত্ত্বাবধান করছেন। ল্যাবটির অংশীদারদের মধ্যে চীনের নৌবাহিনীর সাবমেরিন একাডেমিও রয়েছে বলে একাডেমির ওয়েবসাইটে উল্লেখ আছে। উ রয়টার্সের প্রশ্নেরও জবাব দেননি।

চীনের এই মানচিত্রায়ন ও পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম একত্রে তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সাবমেরিন শনাক্ত করার এবং বিশ্বের সবচেয়ে বিতর্কিত জলসীমাগুলোর কিছুতে নিজস্ব সাবমেরিন মোতায়েনের উন্নত সক্ষমতা দিয়েছে। সিঙ্গাপুরের আরএসআইএস ইনস্টিটিউট অব ডিফেন্স অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিষয়ক সিনিয়র ফেলো কলিন কো বলেন, ‘এটি চীনের দূর সমুদ্রে পৌঁছানোর সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। শান্তিকাল হোক বা যুদ্ধ, তারা এখন যে সামুদ্রিক অঞ্চলে কাজ করতে চায়, তার একটি যথেষ্ট পরিষ্কার চিত্র তাদের কাছে রয়েছে।’

চীনা গবেষকেরাও তাদের কাজের কৌশলগত গুরুত্ব দেখছেন। ওশান ইউনিভার্সিটির গবেষক ঝৌ ছুন, যিনি ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের সেন্সর অ্যারেগুলোর তত্ত্বাবধান করেন, গত বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন যে এই কাজ তাঁকে তাঁর দেশের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা ও সামরিক সক্ষমতার ‘দ্রুত উন্নয়ন’ প্রত্যক্ষ করার সুযোগ দিয়েছে। তিনিও রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেননি। ভবিষ্যতের জন্য ঝৌ অঙ্গীকার করেন, তিনি ‘সবচেয়ে উন্নত বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অর্জনগুলোকে আমাদের নৌবাহিনীর জন্য সমুদ্রে নতুন ধরনের যুদ্ধ সক্ষমতায় রূপান্তর করবেন।’

অনুবাদ করেছেন আব্দুর রহমান

প্রায় ত্রুটিহীন ঘড়ি উদ্ভাবন করেছেন চীনা বিজ্ঞানীরা, ড্রোন যুদ্ধে বড় পরিবর্তনের আভাস

জ্বালানি সংকটে বিশ্ব, দীর্ঘ প্রস্তুতির সুফল পাচ্ছে চীন

আপাতত তাইওয়ান দখলের চিন্তা নেই চীনের: মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন

ইসরায়েলের লারিজানি হত্যা ‘উসকানিমূলক’: চীন

সফরের আগে চীনকে হরমুজ প্রণালির শর্ত দিলেন ট্রাম্প

ট্রাম্পের শুল্কের পরও রপ্তানি আয় বাড়ল

উপসাগরীয় অঞ্চলে দ্রুত যুদ্ধবিরতির আহ্বান চীনের

ইরানে সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা জনসমর্থন পাবে না: চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী

ইরান কেন চীনের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ

রাজনৈতিক সম্মেলনের আগে ৯ শীর্ষস্থানীয় সেনা কর্মকর্তাকে সরাল চীন