মিয়ানমারের পূর্ব শান রাজ্যে রাশিয়ার প্রথম বিনিয়োগকৃত খনি প্রকল্প টাংস্টেন উত্তোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই অঞ্চলে আগে থেকেই পরিচালিত একটি বৃহৎ চীনা খনি প্রকল্পের পাশাপাশি রুশ কোম্পানির প্রবেশ নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও উত্তেজনার আশঙ্কা তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে শান হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন (এসএইচআরএফ)। থাইল্যান্ড থেকে প্রকাশিত মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতীর প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসএইচআরএফ জানায়, মিয়ানমারের সামরিক সরকার রুশ প্রকল্পটিকে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দিয়েছে। খনিটির অবস্থান পূর্ব শান রাজ্যের মংটন টাউনশিপের সর্বোচ্চ পর্বত লই খি লেকের উত্তর দিকে। এলাকাটি থাইল্যান্ড সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে।
অন্যদিকে পর্বতটির দক্ষিণে মং জাউদ গ্রামাঞ্চলে একটি বৃহৎ চীনা টাংস্টেন খনি ইতোমধ্যে উৎপাদন শুরু করেছে। এসএইচআরএফের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হয়। সেখানে উৎপাদিত টাংস্টেন ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মির (ইউডব্লিউএসএ) সহযোগিতায় চীনে পাঠানো হচ্ছে। মং জাউদ এলাকা যৌথভাবে নিয়ন্ত্রণ করে ইউডব্লিউএসএ এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনী।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথম রুশ প্রকল্পটির বিষয়ে জানতে পারেন ২০২৫ সালের মে মাসে। সে সময় একটি রুশ খনিজ জরিপকারী দল এলাকায় আসে। তাদের সঙ্গে ছিল জান্তা সরকারের সেনাসদস্য, পুলিশ ও স্থানীয় মিলিশিয়া সদস্যরা। পরে চলতি বছরের জানুয়ারিতে দলটি দ্বিতীয়বার সেখানে যায় এবং জমি পরিমাপের কাজ করে। তখন কয়েকজন গ্রামবাসীকে জানানো হয় যে, নেপিডো কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে খনিজ উত্তোলনের অনুমতিপত্র দিয়ে দিয়েছে।
এসএইচআরএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরে ইউডব্লিউএসএর এক প্রশাসক স্থানীয় গ্রামবাসীদের রুশ টাংস্টেন খনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে উৎসাহিত করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্ব শান রাজ্যে এটি রাশিয়ার প্রথম খনি উদ্যোগ হলেও রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলে লৌহ আকরিক খাতে দেশটির সম্পৃক্ততা আগে থেকেই রয়েছে। রুশ খনি কোম্পানিগুলো মিয়ানমারের সামরিক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মিয়ানমার ইকোনমিক কো-অপারেশনের (এমইসি) সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছে এবং হোপং টাউনশিপে একটি ইস্পাত কারখানা স্থাপন করেছে।
স্থানীয় জনগণের বিরোধিতা সত্ত্বেও ওই প্রকল্প এখনো চালু রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসএইচআরএফ জানায়, মং জাউদের চীনা টাংস্টেন খনিটি ফেব্রুয়ারিতে উৎপাদন শুরু করে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ১০০ জন চীনা কর্মী কাজ করছেন, যাদের বেশিরভাগই ব্যবস্থাপক ও প্রযুক্তিবিদ। এ ছাড়া প্রায় ২৫০ জন মিয়ানমার নাগরিক শ্রমিকও সেখানে কর্মরত আছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে খনির বর্জ্যে দূষিত পাক গুট ঝরনার পানির সংস্পর্শে এসে আশপাশের গ্রামের মানুষ চর্মরোগে আক্রান্ত হন।
এ ছাড়া খনি থেকে আসা বালুমিশ্রিত পলির কারণে স্থানীয়দের ধানক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খনিতে পানি সরবরাহের জন্য ঝরনার প্রবাহ আটকে দেওয়ায় গ্রামবাসীদের গৃহস্থালি ও কৃষিকাজের জন্য ব্যবহৃত পানির উৎসও শুকিয়ে গেছে।
এসএইচআরএফ আরও বলেছে, পূর্ব শান রাজ্যের খনিজ উত্তোলন শিল্প, বিশেষ করে রেয়ার আর্থ খনিজ ও স্বর্ণখনি কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে চীনা কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণত চীনঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউডব্লিউএসএ এবং মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মির সহযোগিতায় কাজ করে থাকে। এর আগে সংস্থাটি জানিয়েছিল, থাইল্যান্ড-মিয়ানমার সীমান্তজুড়ে রেয়ার আর্থ ও স্বর্ণখনি প্রকল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এর ফলে সীমান্তের উভয় পাশে বসবাসকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠী গুরুতর সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতির মুখে পড়ছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, চীন-সমর্থিত ইউডব্লিউএসএর নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সমর্থনে রুশ কোম্পানির প্রবেশ নতুন রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। শান হেরাল্ড এজেন্সি ফর নিউজের প্রধান সম্পাদক সাই মুয়েং দ্য ইরাবতীকে বলেন, ‘চীনের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তায় ইউডব্লিউএসএ কয়েক দশক ধরে ওই অঞ্চলের সম্পদ উত্তোলন শিল্পে আধিপত্য বজায় রেখেছে।’
তিনি বলেন, ‘রুশ কোম্পানিকে সঙ্গে নিয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও জান্তাপন্থী মিলিশিয়ারা ইউডব্লিউএসএর এলাকায় প্রবেশ করায় সংগঠনটি অবশ্যই অসন্তুষ্ট হবে।’ তাঁর মতে, চীন ও রাশিয়ার ওপর নির্ভরতার মধ্যে ভারসাম্য আনার কৌশলের অংশ হিসেবেই মিয়ানমার সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্ব রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। অস্ত্র ক্রয় ও সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি এখন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতাও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর মিন অং হ্লাইং একাধিকবার রাশিয়া সফর করেছেন। তাঁর সফরগুলোতে জান্তাঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরাও অংশ নেন।
এর ফলে মিয়ানমার ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য, ব্যাংকিং, খনিশিল্প এবং তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। গত ৪ জুন মিয়ানমারের ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়ো সো ২৯ তম সেন্ট পিটার্সবার্গ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ফোরামে অংশ নেন। সেখানে তিনি রুশ বিনিয়োগকারী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিয়ে পৃথক বৈঠক করেন।
চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের তুলনায় এখনো অনেক পিছিয়ে থাকলেও রাশিয়ার সঙ্গে মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৪৪ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে ৭ কোটি ৪৭ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।